বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্যাস বিল বাবদ প্রায় ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বেশি অর্থ পরিশোধ না করে আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানিটি দীর্ঘ সময় ধরে নির্ধারিত ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে বেআইনিভাবে আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) রেটের সুবিধা গ্রহণ করে গ্যাসের বিল কম পরিশোধ করেছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেরও ভিত্তি পাওয়া গেছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি আদালতে দাখিল করা দুদকের উপ-পরিচালক (বিসি অনুঃ ও তদন্ত-১) মো. জাহাঙ্গীর আলমের অনুসন্ধান অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধান এখনো চলমান থাকলেও এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

দুদকের আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চারটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ একত্রে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অভিযোগগুলো হলো: জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি দখল, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি সাধন। অনুসন্ধানের স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে দুদক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় নথি, গ্যাস বিলের হিসাব, মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত আদেশ, চুক্তিপত্র এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নথি বিশ্লেষণের পর দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে, গ্যাসের বিল নির্ধারণে নিয়ম বহির্ভূতভাবে আইপিপি রেটের সুবিধা গ্রহণের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পায়নি।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানুয়ারি ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে গ্যাস বিল বাবদ ৪৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১১ টাকা ৭৫ পয়সা পরিশোধ করেনি। একইভাবে অক্টোবর ২০১৮ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে আরও ৪৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৪ টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দুই প্রতিষ্ঠানের বকেয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ১৫ টাকা ৭৫ পয়সা। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে আইপিপি রেট প্রযোজ্য দেখিয়ে কম হারে গ্যাসের বিল পরিশোধের মাধ্যমে এই বিপুল অঙ্কের সুবিধা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শুধু রাজস্ব ফাঁকি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে কোন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কোন হারে বিল প্রযোজ্য হবে, তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নীতিমালা ও সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শ্রেণির পরিবর্তে কম দরের অন্য কোনো শ্রেণির সুবিধা গ্রহণ করে, তাহলে তা সরকারি বিধিমালার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

দুদকের অনুসন্ধানে এমন অনিয়মের বিভিন্ন নথিভিত্তিক তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিযোগটি বিচ্ছিন্ন কোনো আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং এর সঙ্গে একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগও যুক্ত রয়েছে। সরকারি অর্পিত সম্পত্তি জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে দখলের অভিযোগ, বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও একই অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। এসব অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন সংস্থা থেকে নথি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ চলছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের বিবরণী, কোম্পানির আর্থিক লেনদেন, কর নথি, গ্যাস বিল পরিশোধের হিসাব এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্রও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। অনুসন্ধানের স্বার্থে একাধিক কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

আইন অনুযায়ী, কোনো অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে দুদক আরও বিস্তারিত তদন্ত পরিচালনা করতে পারে। তদন্তে অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, দণ্ডবিধি, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অথবা প্রযোজ্য অন্যান্য আইনে মামলা দায়ের করা হতে পারে। তবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে অভিযোগগুলোকে এখনও তদন্তাধীন বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

দুদকের আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ পর্যন্ত প্রাপ্ত নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি। আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করা হবে। এরপর কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ ও বিল পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্যাস বিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর বড় অঙ্কের রাজস্ব আসে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘ সময় ধরে নির্ধারিত হারের পরিবর্তে কম হারে বিল পরিশোধ করে থাকে, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট গ্যাস কোম্পানির আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের অভিযোগের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি বলে তারা মনে করেন।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ¦ালানী খাতের কোম্পানি ইউনাইটেড পাওয়ারের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইন মেনে পরিচালিত হওয়া বিনিয়োগকারীদের আস্থার অন্যতম ভিত্তি। ফলে অনুসন্ধানের চূড়ান্ত ফলাফল এবং কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

নাম প্রকাশে অন্নিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধান এখনো চলমান থাকায় এ মুহূর্তে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। তবে এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা নথি, তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দেওয়া রেকর্ড পর্যালোচনায় অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে। এরপর কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।