আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ পর্যায়ে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) অপছন্দের তালিকায় থাকা প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে ডিএসইতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সামগ্রিক পুঁজিবাজারেও পড়তে পারে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকারের প্রতি দ্রুত বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত ও পুনর্বহালের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে জনমনে সৃষ্ট সংশয় দূর করার আহ্বান জানান তারা।

একাধিক সূত্র অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ, কারণ দর্শানোর সুযোগ কিংবা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছাড়াই ধাপে ধাপে প্রায় ১৪০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে কয়েকজনের হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর এক নারী কর্মকর্তা অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন এবং আরেক কর্মকর্তা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুরো ডিএসইজুড়ে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা গণছাঁটাই বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে ডিএসইর পুরোনো ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন তারা। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাবি করেন, যথাযথ কারণ ও প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাদের অনেককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এতে তারা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের দাবি, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তাহলে আইন ও বিধি অনুযায়ী তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল এবং প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

জানা গেছে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে এমন বিতর্ক শুধু ডিএসইর ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর বর্তমান প্রশাসনের বেশকিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রচলিত নিয়ম ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ডিএসইর ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনের এই পক্ষপাতমূলক ও খামখেয়ালি আচরণে প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিয়োগ-বাণিজ্য চালানো হচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা এই ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার হাতে চাকরিচ্যুতির চিঠি তুলে দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সম্প্রতি চিঠি হাতে পাওয়ার পর ডিএসইর এক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সহকর্মীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। অন্যদিকে, আকস্মিক চাকরি হারিয়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার এবং পরিবারের চরম অনিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে আরেক কর্মকর্তা আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সহকর্মীদের সময়োচিত হস্তক্ষেপে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও ওই কর্মকর্তার মানসিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এভাবে একের পর এক ছাঁটাইয়ের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। চাকরি অবসানের পর সংশ্লিষ্ট কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন বলে জানা যায়।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান বলেন, ডিএসইতে সুশাসন কিছু আছে বলে মনে হয় না। করপোরেট গভর্ন্যান্সের ন্যূনতম বালাই নেই। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কুক্ষিগত করে চালানো হচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, ডিএসইতে যা হচ্ছে তা অত্যন্ত অমানবিক। কোনো নোটিশ, কারণ দর্শানো ছাড়াই ৩০-৩৫ বছরের অভিজ্ঞ কর্মীদের টার্মিনেশন লেটার ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাউকে বের করতে হলে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক বা আর্লি রিটায়ারমেন্ট স্কিম করা দরকার। ডিএসইর প্রতিটি কর্মীর মনে আতঙ্ক আমার নাম আছে কিনা? ছাঁটাইকৃতরা পাঁচ মিনিট আগেও জানত না চাকরি নেই।

ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট-২০১৩ এর ১৮(ছ) ধারা ও সংবিধান অনুযায়ী ২০১৩ সালের আগের কর্মীদের চাকরির সুরক্ষা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। তা লঙ্ঘন করা হয়েছে। সরকার যখন কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে, ডিএসই তখন ১৪০ জনকে ছাঁটাইয়ের প্ল্যান করছে। অবিলম্বে এই অমানবিক প্রক্রিয়া বন্ধ করে মানবিক সমাধানের আহ্বান জানান।