বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি রহিমা ফুড করপোরেশন লিমিটেডের শেয়ারের দামে কারসাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মাত্র আড়াই মাস ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দর অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়েছে ১৪৫ শতাংশ। এমনকি একাধিক বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। এক্ষেত্রে শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া এমনভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যাতে শেয়ার হাতবদল হলেও প্রকৃত মালিকানার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

মালিকানা অপরিবর্তিত রেখে শেয়ার কেনাবেচা করা সিকিউরিটিজ আইনের লঙ্ঘন। কারসাজির অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে এসব অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মো. দেলোয়ার হোসেন নামের এক বিনিয়োগকারী একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একই সঙ্গে ক্রেতা এবং বিক্রেতার দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছেন। শেয়ারের প্রকৃত মালিকানা পরিবর্তন না করেই নিজেদের মধ্যে শেয়ার স্থানান্তরের ঘটনাটি রহিমা ফুডের শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে। বিষয়টিকে সন্দেহজনক লেনদেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

কমিশনের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্ত দল রহিমা ফুডের শেয়ার লেনদেনের পর্যালোচনা করে। মূলত ২০২৫ সালের ১৫ জুন থেকে শুরু করে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের লেনদেন নিয়ে তদন্ত পরিচালিত হয়। তদন্ত দল দেখতে পায়, আড়াই মাস সময়ের মধ্যেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৬৮ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বেড়ে ১৬৮ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শেয়ারটির দর বৃদ্ধি পায় ১০০ টাকা বা ১৪৫ দশমিক ১৪ শতাংশ।

ওই সময়ে বিনিয়োগকারী মো. দেলোয়ার হোসেন রহিমা ফুডের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিলেন। তিনি তিনটি বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার লেনদেন করেন। অ্যাকাউন্টগুলো এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ, শেলটেক ব্রোকারেজ এবং আইআইডিএফসি সিকিউরিটিজে খোলা হয়েছিল।

তদন্তে তার নাম মো. দেলোয়ার হোসেন এবং ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন হিসেবে পাওয়া যায়। এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তিনি ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫৮৩টি শেয়ার কেনেন ও ২ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৩টি শেয়ার বিক্রি করেন। তদন্তকালে তার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল লেনদেনের প্রায় ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তিনিই শেয়ারটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রেতা ছিলেন। ক্রয় ও বিক্রয় উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষে ছিলেন তিনি।

তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই সকাল ১০টা ১০ মিনিটে দেলোয়ার হোসেন একটি হাওলা লেনদেনের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রিত দুটি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ২ হাজার ৮৬টি রহিমা ফুডের শেয়ার স্থানান্তর করেন। লেনদেনে শেয়ারের মূল্য ছিল ১৩৪ টাকা। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই ছিলেন তিনি। ফলে প্রকৃত মালিকানায় পরিবর্তন ঘটেনি।

এতে বাজারে কৃত্রিম চিত্র তৈরি হয়, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ ১৯৬৯-এর ধারা ১৭ (ই)(৩) অনুযায়ী নিষিদ্ধ। শীর্ষ লেনদেনকারীদের মধ্যে আব্দুল মোবিন, আব্দুল হাফিজ জোয়ারদার তুহিন, তাসনিয়া তাহসিন, কৃষ্ণ দাস, বিজন পাল, ইমরানী, নাজমুল হোসেন, আলমগীর কবীর, সত্যজিত মজুমদার ও এ কে এম গোলাম বোহলুল সক্রিয় ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক মেলেনি।

আব্দুল মোবিন ২ লাখ ৬৩ হাজার ২১টি শেয়ার ক্রয় ও ২ লাখ ২৫ হাজার ৪০২টি বিক্রি করেন। তুহিন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৭০টি ক্রয় ও ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭০টি বিক্রি করেন। তাসনিয়া ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭০৪টি কিনে সমপরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন। এ ছাড়া কৃষ্ণ দাস, বিজন পাল ও ইমরানীও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার ক্রয় এবং বিক্রয় করেছেন।