আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: রাজধানীর অনেক বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস থাকলেও চুলায় ঠিকমতো গ্যাস মিলছে না। ফলে রান্নার জন্য দিন দিন বাড়ছে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরতা। কিন্তু সেই বিকল্প জ্বালানিতেও এখন স্বস্তি নেই। ফলে হঠাৎ তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় দেশের বাজারে বেড়েই চলেছে পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। দোকানে লাইন ধরে সাজানো এলপিজি সিলিন্ডার। বিক্রেতার দাবি, বেশির ভাগই খালি। কিছুতে গ্যাস থাকলেও সেগুলো বিক্রির জন্য নয়; অর্ডারের মাল, শুধু ডেলিভারির অপেক্ষা।

তবে প্রতি সিলিন্ডারে ৫০০ থেকে হাজার টাকা বাড়তি দিলেই পাঁচ মিনিটে মিলছে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার। পাশের গুদাম থেকে এনে রিকশায় তুলে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার হাতে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। আমদানিকারকেরাও মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সরবরাহে ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন। ফলে গৃহস্থালি ও রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে বাজারে একধরনের লুকোচুরি চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে সরকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও রাজধানীর কোথাও কোথাও আড়াই হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেক এলাকায় বাধ্য হয়েই বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস। এ ক্ষেত্রে দাম পড়ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫৫০ টাকা।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ডিলাররা বেশি দাম নিচ্ছেন। তাই তাদেরও সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে বাড়তি দামে। অন্যদিকে ডিলাররা বলছেন, বেশি দাম দিয়ে নিতে হচ্ছে প্রতিটি সিলিন্ডার। কিন্তু সবকিছুর দায় শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের কাঁধে গিয়েই পড়ছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে এমনিতেই নাভিশ্বাস অবস্থা। এর মধ্যেই বাড়তি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কেনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

রাজধানীর মিরপুর শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা চাকরিজীবী আরাফাত আহমেদ জানান, আগেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার নিতে হতো। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়তে বাড়তে এখন আড়াই হাজার টাকায় ঠেকেছে। এটা আমাদের মতো স্বল্পবেতনে চাকরিজীবীদের জন্য অনেক কষ্টের।

শুক্রাবাদের বাসিন্দা মতিউর রহমানও বলেছেন একই কথা। তিনি জানালেন, আড়াই হাজার টাকা দিয়েও একটি সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। মুগদা মানিক এন্টারপ্রাইজের মানিক মিয়া জানান, প্রতিটি সিলিন্ডার তিনি ডিলারের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশিতে আনছেন। সেটায় নিজের লাভ হিসেবে আরও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা যোগ করে খুচরা ক্রেতাদের কাছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

ওই এলাকার ডিলার ঝিলপাড় এন্টারপ্রাইজের এক কর্মচারী জানান, মালিক বলেছেন ২ হাজার ২৫০ টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করতে। তারা সেটাই করছেন। কিন্তু কি কারণে এত দাম বেশি সে বিষয়ে তিনি জানান, আগে থেকেই বাড়তি দামে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্য সরবরাহ করছে।

মোহাম্মদপুরের একজন এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসায়ী জানান, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। তাই এই বাড়তি দাম। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে তা নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে। তবে সেপ্টেম্বরের আমদানির হিসাব উৎসভেদে ভিন্ন। এনবিআরের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টন, যা এপ্রিলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

অন্যদিকে আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াব বলছে, সরকারি আমদানির তথ্য সঠিক নয়। কারণ যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধেই আমদানি কমানো হয়েছে। ফলে এলপিজির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এক মাসের ব্যবধানে এলপিজি আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্গো প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিইআরসির মাসিক মূল্য নির্ধারণে পুরোপুরি সমন্বয় করা হচ্ছে না। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সদস্যদের তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে কার্গো প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি করে বাড়তি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকসান এড়াতে কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি সীমিত রেখেছে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী জানান, সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

বৈশ্বিক নৌপথের জটিলতা দূর না হলে এবং প্রয়োজনীয় কার্গো সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে অক্টোবরেও এলপিজি সংকট থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এদিকে বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী লোয়াবের কাছ থেকে এলপিজি নিতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের চাহিদা জানানোর জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী তাদের চাহিদাপত্র জমা দেননি।

দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত দর না পাওয়ায় এলপিজি আমদানি হয়নি। এ পর্যন্ত একাধিক বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। আর বাংলাদেশের এখন বেশি পরিমাণে এলপিজি সংরক্ষণ করার মতো সক্ষমতা নেই। ফলে সব মিলিয়ে এলপিজি আমদানির বিষয়টি কার্যক্রম অগ্রগতি হয়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি খাতে দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে বিপিসির সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিপিসি গত এক যুগে কয়েকটি এলপিজি অবকাঠামো প্রকল্পের কথা ভাবলেও কোনোটিই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছেনি। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডে বার্ষিক এক লাখ টন সক্ষমতার এলপিজি মজুদাগার ও সরবরাহ প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া কিংবা মাতারবাড়ীতেও বড় আকারের এলপিজি টার্মিনালের পরিকল্পনা ছিল।

তবে কোনো প্রকল্পেরই সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যকরভাবে এগোয়নি। অথচ প্রতিবছর তেল বিক্রি করে বিপিসি বিপুল পরিমাণে মুনাফা করছে। সেই হিসেবে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতা বিপিসির রয়েছে। সুতরাং প্রয়োজনে বোতলজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের জন্য নতুন অবকাঠামো ও প্ল্যান্ট স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম ভিত্তিক বিন হাবিব এলপিজি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, আমরা এলপিজি সরাসরি আমদানি করি না। বিএম এনার্জি থেকে চাহিদা অনুসারে সংগ্রহ করি। এখন তারাও চাহিদা অনুসারে আমদানি করতে পারছে না। ফলে আমাদের মজুদে বিক্রি করার মতো গ্যাস নেই।

বেসরকারি এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটিডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, এখন দেশে এলপি গ্যাসের সরবরাহ সংকটে কথা বলা হচ্ছে, যা পুরোপুরি মিথ্যা। দেশের বাজারে মাসে চাহিদা দেড় লাখ টনের চেয়ে একটু কম। সেখানে গত আগস্টে আমদানি হয় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, আর গত মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। আমদানি অনুযায়ী অপারেটররা গ্যাস বাজারে সরবরাহ করছে। সুতরাং সংকট হওয়ার কিংবা অতিরিক্ত দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।