কাজী শামীম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) শুরু করলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছে সংস্থাটি। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার আগে আগে অর্থাৎ গত ১ ফেব্রুয়ারি ওই তিন সিটি নির্বাচন আয়োজনে চিঠি দেয়। সেই চিঠি আমলে নিয়ে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করে কমিশন। তবে এরই মাঝে দলীয় সরকার গঠন হয়ে যাওয়ায় নতুন সরকারের মতামতও জানতে চায় সংস্থাটি।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গতবছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। এই দুই সিটির মেয়াদ এরই মধ্যে পার হয়েছে।

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এই দুই সিটির ভোট আয়োজনের তাগিদ দিয়ে ইসিকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। অপরদিকে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই হিসাবে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মেয়রের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

এ ছাড়া, ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন, ২০২৩ সালের ১২ জুন খুলনা সিটি নির্বাচন, একই বছরের ২১ জুন সিলেট সিটি করপোরেশন ও ২৫ মে গাজীপুর সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেগুলোর মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। এইসব সিটিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য এখনো সময় আছে।

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতে আত্মগোপনে চলে যান বিভিন্ন সিটির মেয়ররা। আর অন্তর্বর্তী সরকার ১৯ আগস্ট সব সিটির মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে। ওই সময় থেকেই প্রশাসক দিয়ে চলছিল বাংলাদেশের সিটি করপোরেশনগুলো।

কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশনগুলোতে দলীয়ে নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

‎‎গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশের ছয় সিটি করপোরেশনে ছয় জনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন- ‎ঢাকা দক্ষিণে মো. আব্দুস সালাম, ‎ঢাকা উত্তরে মো. শফিকুল ইসলাম খান, ‎খুলনায় নজরুল ইসলাম মঞ্জু, ‎সিলেটে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, ‎নারায়ণগঞ্জে মো. সাখাওয়াত হোসেন খান ও‎ গাজীপুরে মো. শওকত হোসেন সরকার।

‎রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসকদের এই নিয়োগ মূলত আসন্ন নির্বাচনের একটি প্রাথমিক মহড়া। একদিকে জনসেবার মাধ্যমে জনগণের মন জয় করা, অন্যদিকে দলীয় সাংগঠনিক শক্তি পরীক্ষার একটি চ্যালেঞ্জ এখন এই নতুন প্রশাসকদের সামনে। এখন প্রশ্ন এই উদ্যোগের ফলে কি পিছিয়ে যাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন? নাকি আরও ত্বরান্বিত হবে নির্বাচন প্রক্রিয়া?

ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চিঠি এসেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের পাঠানো দুটো পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়।

সে অনুযায়ী এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী এই সিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভা শেষে পরবর্তী পাঁচ বছর।
পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হযয়েছে চিঠি দু’টিতে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমরা এ নিয়ে শিগগিরই বসব। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সরকারের। কমিশন কেবল তা আয়োজন করে থাকে। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের তো আলাপ হবেই।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর মেয়র, চেয়ারম্যানরা পদত্যাগ করায় ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বহিষ্কার করে সরকার। ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত বর্তমানে সেগুলোকে প্রশাসক দিয়ে চালাচ্ছে সরকার। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হন শাহাদাত হোসেন। তার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটের জন্য চিঠি কোন সরকারের আমলে এসেছে? এখন কোন সরকার আছে? চিঠি এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তাদের সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার ক্যারি করবে কি না, বা করলেও কীভাবে করবে, সেটাও তো জানা দরকার। আমরা সে মতামতও নেব। কেননা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকারের। এটা কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়। কাজেই তাদের মতামতই এখানে প্রাধান্য পাবে। তবে আমাদের প্রস্তুতি আমাদেরই রাখতে হবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিএনপি। এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচিতদের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন শপথ পড়ালে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর মন্ত্রিসভা গঠন হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রিত্ব পান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকাসহ অন্য সিটি করপোরেশনগুলোতে নতুন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।

নতুন সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মাথায় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রশাসক নিয়োগ হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সঠিক সময়েই হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সরকারি কতগুলো নিয়ম কানুন আছে। সরকারি যে সব প্রথাগুলো আছে, সেগুলোর মধ্যে কতগুলো মেয়াদ আছে, কতগুলো মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সবগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসে আমরা সরকারের তরফ থেকে একটা সঠিক সময়ে এই নির্বাচনগুলো দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তবে নিঃসন্দেহে এই নির্বাচনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।