স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা ও আর্থিক খাতে প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়ায় সন্তুষ্ট নয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এই কারণে ১৩০ কোটি ডলারের ঋণের কিস্তির সঙ্গে বাজেট সহায়তা হিসেবে বাড়তি দুই বিলিয়ন ডলার পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের জেরে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় সরকারি কোষাগারে চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরেই সরকারের সামনে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলার জোগানের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

একদিকে আইএমএফের ঋণ ও সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি দ্বিমুখী চাপ মোকাবিলায় সরকার বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে মোট ৩৪৫ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চাইছে। তবে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থাকার কারণ দেখিয়ে ঋণ কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত মিশন এপ্রিলের পরিবর্তে জুলাইয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আগে থেকেই ছিল।

গত ২৪ মার্চ সংস্থার এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বাংলাদেশ সফর করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। জুনের আগে দুই কিস্তিতে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়ার বিষয়টি তখনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে গত ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল চলমান ঋণ কর্মসূচি এবং অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আইএমএফের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। তবে সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বাংলাদেশকে কয়েকটি কঠোর শর্ত দিয়েছে।

এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে– জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রত্যাহার, করছাড় বাতিল এবং ভ্যাটের অভিন্ন হার চালু করা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতের কাঠামোগত সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। তবে নতুন সরকার সব শর্ত মানতে রাজি নয়। বিশেষত সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার চালু করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ফলে চলমান ঋণ কর্মসূচির পাশাপাশি বর্ধিত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বোর্ড অব গভর্নরসের বসন্তকালীন সভা থেকে ফিরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের আলোচনা চলমান রয়েছে। কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হলেও বেশ কিছু সংস্কার ইস্যুতে এখনও সমাধান বাকি। তিনি ইঙ্গিত দেন, সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কিছু ক্ষেত্রে সময় লাগছে। চলমান আলোচনার মাধ্যমে আইএমএফের সঙ্গে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তার আশা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছে এবং এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে এআইআইবির কাছেও ৭৫ কোটি ডলার চাওয়া হয়েছে, যেখানে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে এডিবির কাছ থেকে নিয়মিত তহবিলের আওতায় মোট ১০০ কোটি ডলার (৭৫০ মিলিয়ন + ২৫০ মিলিয়ন) বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

উভয় পক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঋণের বিষয়টি চূড়ান্ত হলে আগামী মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রথমে চলতি অর্থবছরের জন্য ৫০ কোটি ডলার চাইলেও জাইকা তা দিতে অপারগতা জানিয়েছে। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য আলোচনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন মোট ১২০ কোটি ডলার (৫০০ + ৭০০ মিলিয়ন) চেয়ে আলোচনায় যাচ্ছে। এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে জাইকার একটি প্রতিনিধিদল আগামী ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশে আসবে।

এই বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর নজরুল হুদা বলেন, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এতে রিজার্ভ ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য বজায় থাকে। দেশীয় ঋণ নিলে বিনিয়োগ কমে আর টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। তবে ঋণ নেওয়ার আগে পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জাপান এশিয়া অঞ্চলের জন্য একটি জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন করেছে। বাংলাদেশ সেই তহবিল থেকেই অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করবে। তবে চলতি অর্থবছরে এই উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

উল্লেখ্য, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, একই বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তিতে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তিতে ১১৫ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।

অর্থাৎ তিন কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ২৩১ কোটি ডলার পেয়েছে। ফলে মোট ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির মধ্যে এখনও প্রায় ২৩৯ কোটি ডলার পাওয়া বাকি রয়েছে।