আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও খরা কাটার কোনো লক্ষণ নেই। বিনিয়োগকারীদের নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য আরও অন্তত এক বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। প্রায় দুই বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আসা বন্ধ রয়েছে। নতুন বিধিমালা জারি হলেও বাজারে দ্রুত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

ফলে আগামী নভেম্বরের আগে নতুন আইপিও আসার সম্ভাবনাও নেই। আইপিও আইন সংশোধন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই সংশোধিত পদ্ধতির অধীনে কোনো আইপিও সংক্রান্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। শুধু তাই নয় আগের নিয়মেও কোনো প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে জমা নেই বলে জানা গেছে।

এছাড়া দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়াগ ঋণাত্মক। এর মানে হচ্ছে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নতুন বিনিয়োগের তুলনায় প্রত্যাহার করে নেয়ার পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে গত দুই বছর ধরে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেননি উদ্যোক্তারা। সামগ্রিকভাবে আস্থা সংকটের কারণেই উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক যুগে পুঁজিবাজারে বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগের পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। এর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এসেছিল। এরপরের দুই অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ কমলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়েছিল। তবে এর পর থেকেই পুঁজিবাজারে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী।

২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়েও বিদেশীদের নিট পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ঋণাত্মক ৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।

এদিকে ২০২০ সালে দেশে সর্বোচ্চ ৪৭৩ কোটি ডলারের পোর্টফোলিও বিনিয়োগ এসেছিল। তবে এরপর থেকেই পতনের ধারা শুরু হয়। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি ডলারে, ২০২২ সালে ২৫৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে, ২০২৩ সালে ২০৮ কোটি ডলারে এবং ২০২৪ সালে ১৭০ কোটি ডলারে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫ সালে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ আরও সাড়ে ৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৫৫ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে।

এদিকে পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৬ সালের শুরুতেই বিএসইসি আইপিও আইন বা ‘পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’-এ আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এই নিয়ম কার্যকর হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাজারে ‘জাঙ্ক’ বা দুর্বল কোম্পানির প্রবেশ রোধ করা। নতুন নিয়মে কোম্পানিগুলোকে একটি অর্থবছর বা পঞ্জিকা বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, অথবা নিরীক্ষিত ত্রৈমাসিক বা অর্ধ-বার্ষিক বিবরণীসহ আইপিও প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণীসহ প্রস্তাব জমা দিয়ে থাকে। বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে প্রাথমিক শেয়ার ইস্যু করার জন্য কোনো প্রস্তাব জমা দেয়নি। সংশোধিত পাবলিক ইস্যু বিধিমালা অনুসারে, একটি কোম্পানি তার হিসাব বছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে প্রস্তাব জমা দিতে পারবে। এখন পর্যন্ত কোনো আবেদন না পড়ায় যে কোম্পানিগুলো ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণ করে তাদের প্রস্তাব জমার সময় এপ্রিলে শেষ হয়েছে।

এক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীসহ আইপিও প্রস্তাব জমা দিতে ইচ্ছুক কোনো কোম্পানির অন্তত ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে বিনিযোগকারীদের নতুন আইপিওর জন্য নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর আগে আইপিও প্রস্তাব জমা দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের মধ্যবর্তী সময় দীর্ঘ ছিল। সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, আইপিও প্রক্রিয়ায় স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যু ম্যানেজার এবং সিকিউরিটিজ কোম্পানিগুলোর নিজ নিজ কাজ সম্পন্ন করার জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে ফিক্সড প্রাইস বা বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে একটি আইপিও প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে সর্বোচ্চ ২০ দিন সময় নেবে। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে একটি আইপিও প্রস্তাব অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ৪০ দিনের মধ্যে এবং বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৫৩ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। সংশোধিত পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে যে, কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী হলে তারা উচ্চতর প্রিমিয়াম দাবি করতে পারবে।

বিএসইসির সংশোধিত বিধিমালায় পূর্বে তালিকাভুক্তিতে যেসব বিষয়গুলো বাধা দিত এবং আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করত, নতুন বিধিমালায় সেগুলোর সমাধান করা হয়েছে। সংশোধিত বিধিমালায় একাধিক আইপিও মূল্যায়ন পদ্ধতিরও অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই এই সংশোধিত পদ্ধতির অধীনে কোনো আইপিও প্রস্তাব জমা দেয়নি।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম বলেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর কেউ কোনো আইপিওর জন্য আবেদন করেননি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগে ছয়টি আবেদন প্রক্রিয়াধীন ছিল। সেগুলোর মধ্যে রুল কমপ্লায়েন্স না থাকায় পাঁচটি আবেদন বাতিল করা হয়েছে এবং একটি আবেদন আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

কেউ যদি নতুন আইন অনুযায়ী আইপিওর আবেদন করে এবং সব শর্ত পূরণ করে, তাহলে কমিশন অনুমোদন দিতে সময় নিবে না। তবে নতুন কোম্পানি বাজারে আনার ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে ইস্যু কোম্পানি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে। একজন রেগুলেটর হিসেবে যতটুকু করা সম্ভব, কমিশন তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে সবাইকে নিয়ম মেনেই আসতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে আইপিও সাফল্যের জন্য সেকেন্ডারি মার্কেটের স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বর্তমানে বাজারে যে তারল্য সংকট এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব রয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বড় কোনো আইপিও আনা হলে তা সফল হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অক্টোবর-নভেম্বর নয় আগে সেকেন্ডারি মার্কেটকে স্থিতিশীল করতে হবে। এরপর আইপিও বাজারে আসুক এমনটাই ভালো হবে বলে মনে করেন তারা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পুঁজিবাজারে আইপিও কার্যক্রম অত্যন্ত ধীরগতিতে চলেছে। ওই বছর মাত্র ৪টি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এগুলো হলো এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস। এর মধ্যে এনআরবি ব্যাংকের শেয়ার অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে।

বর্তমানে শেয়ারটি ৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ২০২৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় মিডল্যান্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সিকদার ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। ২০২২ সালে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ইন্সুরেন্স, চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স, জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট, ইসলামী কর্মাশিয়াল ইন্স্যুরেন্স এবং নাভানা ফার্মা। তবে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের জন্য তাড়াহুড়ো করে নিম্নমানের কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার চেয়ে সময় নিয়ে ভালো কোম্পানি আনা বেশি জরুরি বলেও তিনি মনে করেন।