আইপিওতে এগোচ্ছে প্রতিবেশীরা পিছিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকট ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সূচকের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা চললেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সেটি হলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজার। গত দুই বছরে দেশের মূলধারার পুঁজিবাজার কিংবা এসএমই কোনো বাজারেই নতুন একটি আইপিও অনুমোদন পায়নি। একই সময়ে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলো শত শত নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে এসে হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছে।
ফলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। ফলে পুঁজিবাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে একটি উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক রেকর্ড।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টানা দুই বছরে বাংলাদেশে মূল বাজার কিংবা এসএমই বাজার—কোনোটিতেই কোনো নতুন আইপিও অনুমোদন পায়নি। ফলে এ সময়ে আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে কোনো অর্থও সংগ্রহ হয়নি। অন্যদিকে একই সময়ে ভারতে মূল বাজারে ১৯৭টি এবং এসএমই বাজারে ৪৭৮টি আইপিও সম্পন্ন হয়েছে। এসব আইপিওর মাধ্যমে মূল বাজার থেকে ৩ লাখ ৫১ হাজার ২৫৩ কোটি রুপি এবং এসএমই বাজার থেকে ২১ হাজার ৭৯৯ কোটি রুপি সংগ্রহ করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় একই সময়ে মূল বাজারে ৪২টি এবং এসএমই বাজারে একটি আইপিওর মাধ্যমে যথাক্রমে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি ও ৩০০ কোটি রুপিয়াহ সংগ্রহ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মূল বাজারে ২৩টি এবং এসএমই বাজারে ১০৭টি আইপিওর মাধ্যমে যথাক্রমে ১ হাজার ২০ কোটি ও ৬০০ কোটি রিংগিত সংগ্রহ করা হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে মূল ও এসএমই উভয় বাজারেই আইপিওর সংখ্যা এবং তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ ছিল শূন্য।
২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাংলাদেশে নতুন কোনো আইপিও অনুমোদন হয়নি। ওই সময়ে ভারতে মূল বাজারে ৭৭টি ও এসএমই বাজারে ২১৬টি, ইন্দোনেশিয়ায় মূল বাজারে ২৯টি ও এসএমই বাজারে একটি এবং মালয়েশিয়ায় মূল বাজারে ১৩টি ও এসএমই বাজারে ৫৩টি আইপিও সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশের আইপিও বাজারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ ওই সময়ে ভারতে মূল বাজারে ১২০টি ও এসএমই বাজারে ২৬২টি, ইন্দোনেশিয়ায় ১৩টি এবং মালয়েশিয়ায় মূল বাজারে ১০টি ও এসএমই বাজারে ৫৪টি আইপিও সম্পন্ন হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারের গভীরতাও বাড়েনি। তাদের অভিযোগ, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন আগের বিএসইসি কমিশনের আইপিও অনুমোদনে অনীহা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণেই বাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলো আইপিওকে মূলধন সংগ্রহের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তাদের পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করেছে।
এ অবস্থায় গত মাসের শুরুতে দায়িত্ব নেওয়া মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন আইপিও বাজারে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কমিশন পাবলিক ইস্যু রুলস যুগোপযোগী করার পাশাপাশি আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও বিনিয়োগবান্ধব করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সম্প্রতি বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাবলিক ইস্যু রুলসে যৌক্তিক পরিবর্তন আনা হবে। বিদ্যমান আইন আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব না হলে শেয়ারবাজারের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং অনুমোদন পেতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগে। অন্যদিকে ব্যাংক থেকে তুলনামূলক দ্রুত অর্থায়ন পাওয়া যায় বলে অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারায়। তাই আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও সময়োপযোগী করা হবে।
ডিএসইর সাবেক পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, টানা দুই অর্থবছর কোনো প্রতিষ্ঠানের আইপিও না আসা অস্বাভাবিক। প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যাংকঋণ সহজলভ্য হওয়া আইপিও কম আসার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি আগের কমিশনের আইপিও নিয়ে অনীহাও ছিল।
বাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নীতিগত যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে।



