৬ বছর ধরে লভ্যাংশ বঞ্চিত ফারইস্ট লাইফ ইন্সুরেন্সের শেয়ারহোল্ডারা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও তহবিল তছরুপ এবং তীব্র তারল্য সংকটের কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরে লভ্যাংশ এবং বীমার মেয়াদপূর্তির টাকা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। কোম্পানির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ফলে এই করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এছাড়া টানা ছয় বছর ধরে কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। তেমনি গ্রাহকদের ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকার বীমা দাবি বছরের পর বছর ঝুলে আছে। এর মধ্যেই ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা আইন অনুযায়ী ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্তও পূরণ করছেন না। আর্থিক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে রয়েছে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিধি অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে সব সময় অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক পরিচালকের ব্যক্তিগতভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। কিন্তু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ তথ্য বলছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে মাত্র ২০ দশমিক ০৮ শতাংশ শেয়ার।
অর্থাৎ তারা সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্তই শুধু ভঙ্গ করেননি, কয়েকজন পরিচালক ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার রাখার বাধ্যবাধকতাও পালন করছেন না। এদিকে কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১৯ সালের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। এরপর টানা ছয় বছর কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের রিটার্ন ছাড়াই শেয়ার ধরে রেখেছেন।
শুধু বিনিয়োগকারীরাই নন, সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন কোম্পানিটির গ্রাহকেরা। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তথ্য অনুযায়ী, জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবির প্রায় ৭৫ শতাংশই ফারইস্ট ইসলামী লাইফের। বর্তমানে কোম্পানিটির কাছে গ্রাহকদের ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার বীমা দাবি আটকে আছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে কোম্পানিটি পরিশোধ করেছে মাত্র ২৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বকেয়া দাবি আরও ৩৯২ কোটি টাকা বেড়েছে। এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। ২০২১ সালে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে পরিচালিত আইডিআরএর এক বিশেষ নিরীক্ষায় দেখা যায়, কোম্পানি থেকে ২ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পাশাপাশি হিসাবপত্রে আরও ৪৩২ কোটি টাকার অসঙ্গতি ধরা পড়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাজারদরের কয়েক গুণ বেশি দামে জমি কেনা, কোম্পানির অর্থ ব্যাংক ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহার এবং বিভিন্ন উপায়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে আসে। এই আর্থিক সংকটের সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। নূর হোসেন নামের এক গ্রাহকের ১২ বছর মেয়াদি একটি বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালে।
কিন্তু চার বছর পার হলেও তিনি এখনো টাকা পাননি। তিনি বলেন, ২০২২ সালে পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে। বারবার যোগাযোগ করেও টাকা পাচ্ছি না। নিজের টাকা তুলতে এখন অফিসে অফিসে ঘুরতে হচ্ছে।
মেয়াদোত্তীর্ণ বীমা পলিসির অর্থ ফেরতের দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক দিন পরপর বিক্ষোভ করছেন
গ্রাহকেরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুলাই রংপুরে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কয়েকশ গ্রাহক। তারা অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে সরকারের ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া গ্রাহকদের বড় একটি অংশ ছিলেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও নারী। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের আশ্বাসে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে বছরের পর বছর প্রিমিয়াম পরিশোধ করেছেন। কেউ দিনমজুরির আয় থেকে, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা বা কৃষিকাজের উপার্জন থেকে, আবার কেউ সংসারের প্রয়োজন সীমিত করে এই অর্থ জমিয়েছেন। কিন্তু পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও তারা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। বরং টাকা চাইতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী ৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোম্পানির বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। বর্তমানে ওই অর্থ উদ্ধারে কোম্পানির বিভিন্ন সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায় করা গেলে তা কোম্পানির আর্থিক দায় পরিশোধ ও লভ্যাংশ প্রদান এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে।



