তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠনসহ একের পর এক নীতিগত সুবিধা দেওয়া হলেও ব্যাংক খাতের পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন সময়ে পুনঃতপশিল, ঋণ পুনর্গঠন এবং বিশেষ নীতিগত সুবিধা দিয়েছে। সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আবার সচল করে ঋণ আদায়ের লক্ষ্যেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নীতিগত এসব সুবিধার পরও খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ফলে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন এই তিন মাসে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে দশমিক ৫২ শতাংশ পয়েন্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপির খাতায়। তিন মাস আগে গত মার্চের শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সে সময় মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল খেলাপি। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চিত্র গত দুই বছরে নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ২০২৪ সালের জুন শেষে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ ওই এক বছরেই খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। পরের এক বছরে খেলাপি ঋণের অঙ্ক আরও বেড়ে ২০২৬ সালের জুন শেষে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা এবং বিপুল পরিমাণ বিতরণ করা ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর অন্যতম। এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে পুরো ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো কঠিন হবে। বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঋণ পুনঃতপশিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের জন্য সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো আদায়যোগ্য ঋণগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। তবে বিভিন্ন নীতিগত ছাড় দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আগের সরকারের সময়ে বিশেষ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীকে অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া অনেক ঋণ দীর্ঘদিন বিভিন্ন উপায়ে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল। বারবার নবায়ন ও পুনঃতপশিলের মাধ্যমে এসব ঋণের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করা হয়।
এখন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হওয়ায় প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে যেসব ঋণ বছরের পর বছর নবায়ন করা হলেও মূল টাকা আদায় হয়নি, সেগুলোর একটি বড় অংশ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে অতীতে গোপন থাকা ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিপুল অঙ্কের ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মুনাফায়। একই সঙ্গে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, খেলাপি ঋণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি আরও বাড়বে এবং তারল্য পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হবে।
কারণ ব্যাংকের বিপুল অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অনুৎপাদনশীল খাতে আটকে থাকছে। এ অবস্থায় শুধু ঋণ পুনঃতপশিল বা নতুন নীতিগত সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ এবং অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে খেলাপি ঋণের পাহাড় আরও বড় হতে পারে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, সরকারের দুর্বল নীতি ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবের কারণে খেলাপি ঋণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দেশে একটি প্রচলিত সংস্কৃতি রয়েছে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে যান বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেড়ান। ফলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া তাদের ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়।
তবে যথাযথ তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় একপর্যায়ে এসব অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। এটি মূলত দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অভাবেরই প্রতিফলন।
এছাড়া অর্থঋণ আদালতের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতাকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।



