দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: গত মাসে গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের পণ্য রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শীর্ষ খাতগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এতে গত আগস্টে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশ। গত বছরের আগস্টের চেয়ে রপ্তানি বাড়লেও গত জুলাইয়ের চেয়ে কমেছে। গত জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরজুড়ে রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতার ধারাবাহিকতা নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন অর্থবছর। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে রপ্তানি আয়ে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। তবে আগস্টে এসে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে দেশের রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে রপ্তানি আয়ও ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ তথ্য প্রকাশ করে।

২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ মাসে রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল ৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। তবে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে এই বড় উল্লম্ফন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। বিশেষ করে দেশে যখন গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট চলছে এবং এর প্রভাবে শিল্প-কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, তখন রপ্তানি আয়ে এতটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কয়েকজন রপ্তানিকারক।

তাদের মতে, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং শ্রমিকদের ছুটিতেও পাঠাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগস্টের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান শিল্পের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইপিবি জানায়, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকলেও প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশের ওপর ক্রেতাদের আস্থা বাড়ায় আগস্টে রপ্তানি আয় শক্তিশালী হয়েছে।

এ ছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের উদ্যোগও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির সিংহভাগ জোগান দেওয়া তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতই আগস্টের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।

আগস্টে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল ৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ও ৫ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৭ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।

আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধিতে প্রধান বাজারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও কানাডায় বাংলাদেশের পণ্যের আমদানি বেড়েছে। এসব বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধিই আগস্টের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ২৬ শতাংশ বেড়ে ৯৪৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে দেশটিতে রপ্তানি আয় ছিল ৭৫২ মিলিয়ন ডলার। এ সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে ৪৭৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। স্পেনে রপ্তানি বেড়েছে ২১ দশমিক ৪১ শতাংশ, আয় দাঁড়িয়েছে ৪২২ মিলিয়ন ডলারে। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি ১৫ শতাংশ বেড়ে ২৬২ মিলিয়ন ডলার, কানাডায় ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ বেড়ে ১৪৬ মিলিয়ন ডলার এবং জার্মানিতে ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ৪৯৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন রপ্তানিকারক। তাদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। সংকটের প্রভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং শ্রমিকদের ছুটিও দিতে হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিটওয়্যার খাতের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, রপ্তানি কার্যক্রমের পারফরম্যান্স নিয়ে এখনই মন্তব্য করতে চাই না। কারণ পুরো মাসজুড়েই আমরা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারিনি। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণও ব্যাহত হয়েছে। তাহলে ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কীভাবে হলো, সেটিই এখন প্রশ্ন। এই প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বাস্তবসম্মত কি না, তা যাচাই করা দরকার।

তিনি বলেন, আমি আগে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখবো, এরপর এ বিষয়ে মন্তব্য করবো। কারণ প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সঙ্গে শিল্পের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, রপ্তানি আয়ে আগস্টের বড় প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি অর্থনীতিবিদরাও। তাদের মতে, পরিসংখ্যান বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ না করে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, গত অর্থবছরজুড়েই রপ্তানি আয়ে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। এমনকি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও রপ্তানি আয় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ছিল। ফলে আগস্টে এক লাফে রপ্তানি আয়ে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পেছনে কী ধরনের কারণ কাজ করেছে, তা বুঝতে আরও বিশদ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বছরের আগস্টে পোশাক রপ্তানি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্কের কারণে পোশাকের চালান কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নেও রপ্তানি হ্রাস পেয়েছিল। এই তুলনামূলক কম ভিত্তির বিপরীতে ২০২৬ সালের আগস্টে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেশি দেখালেও বাস্তবে রপ্তানি পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি।

তিনি বলেন, ২০২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ, যা শিল্পের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। তবে চলমান গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিকূল পরিস্থিতির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা, স্থিতিস্থাপকতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সামর্থ্যকে তুলে ধরে।’

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় ৯ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৫৯ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৭৫ মিলিয়ন ডলার। পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১১৯ মিলিয়ন ডলার।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ২৫৮ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ২২৯ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে হোম টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১৩৯ মিলিয়ন ডলার। প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি আয় ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১৩০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে এ খাত থেকে ১০৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইপিবি।