দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে মানসম্পন্ন সিকিউরিটিজের সরবরাহ বাড়ানো এবং বড় কোম্পানিগুলোকে দ্রুত তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলস, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আইপিও ছাড়াই বিদ্যমান শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রেখে প্রণীত খসড়াটির ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে লিখিত মতামত চেয়েছে কমিশন।

কমিশনের অনুমোদিত খসড়ায় আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ডাকযোগে অথবা নির্ধারিত ই-মেইলে মতামত পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। বিধিমালাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশিত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের বিদ্যমান লিস্টিং রেগুলেশনসের ডাইরেক্ট লিস্টিং-সংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নাম্বার প্রবিধান রহিত হবে।

প্রস্তাবিত বিধিমালার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, কোম্পানিকে নতুন মূলধন সংগ্রহের জন্য আইপিওতে যেতে হবে না। বিদ্যমান উদ্যোক্তা ও প্রধান শেয়ারহোল্ডাররা তাদের ধারণ করা শেয়ারের নির্দিষ্ট অংশ অফলোড বা বাজারে বিক্রির মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবেন। সাধারণ ও বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২০ শতাংশ এবং সরকারি বা বৈদেশিক মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার অফলোড বাধ্যতামূলক। এ শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানির তহবিলে যাবে না; সরাসরি শেয়ার বিক্রয়কারী স্পন্সর বা মালিকদের কাছে যাবে।

তবে সব কোম্পানি এ সুবিধা পাবে না। সরকারের সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, অথবা অন্তত ১০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সরকারি শেয়ার থাকা কোম্পানি ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের যোগ্য হবে। বাংলাদেশে পরিচালিত অন্তত ৫১ শতাংশ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৈদেশিক মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানিও এ সুযোগ পাবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অনুমোদিত এবং ন্যূনতম ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের টেলিকম ও আইসিটি অবকাঠামো বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, অন্তত তিন বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে থাকা ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ৫০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক টার্নওভার বা মোট সম্পদশালী বড় শিল্পগোষ্ঠীও এ তালিকায় থাকবে।

ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে প্রতিষ্ঠানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং টানা অন্তত তিন বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে থাকা বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা, পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ এবং কোনো সঞ্চিত ক্ষতি না থাকা প্রয়োজন। সিআইবি ঋণখেলাপি বা ইনভেস্টমেন্ট গ্রেডের নিচে ক্রেডিট রেটিং পাওয়া কোম্পানি এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে না। আবেদনের সঙ্গে সর্বশেষ তিন বছরের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদনও দিতে হবে।

শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে অন্তত দুটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করে রেফারেন্স প্রাইস নির্ধারণ করতে হবে। এর একটি অ্যাবসোলিউট ভ্যালুয়েশন: যেমন ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো বা রেসিডিউয়াল ইনকাম এবং অন্যটি রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন: যেমন পিই রেশিও বা ইভি/ ইবিটডা হতে হবে। রেফারেন্স প্রাইসের অন্তত ২০ শতাংশ কমে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করা হবে।

তালিকাভুক্তির প্রথম ৩০ মিনিট প্রাইস ডিসকভারি পিরিয়ড হিসেবে থাকবে এবং এ সময়ে শুধু বিড গ্রহণ করা হবে। প্রথম দুদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্পট মার্কেটে লেনদেন হবে এবং এ সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কেনা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। তৃতীয় দিন লেনদেন বন্ধ রেখে সেটেলমেন্ট সম্পন্ন হবে; চতুর্থ কার্যদিবস থেকে স্বাভাবিক লেনদেন শুরু হবে।

এদিকে তালিকাভুক্তির পর স্পন্সর ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। প্রথম পাঁচ ট্রেডিং দিনে একজন বিনিয়োগকারী একক অর্ডারে সর্বোচ্চ এক হাজার শেয়ারের বেশি অর্ডার দিতে পারবেন না। তালিকাভুক্তির পর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত স্পন্সর ও পরিচালকরা নতুন শেয়ার কিনতে এবং অফলোডের বাইরে অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না।

পুরো প্রক্রিয়ায় মার্চেন্ট ব্যাংকার, নিরীক্ষক, সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতার বিধান রয়েছে। একজন মার্চেন্ট ব্যাংকারকে ডিউ ডিলিজেন্স সার্টিফিকেট ও ইনফরমেশন ডকুমেন্ট প্রকাশের দায়িত্ব নিতে হবে।

স্টক এক্সচেঞ্জে আবেদনের সময় নির্ধারিত প্রক্রিয়াকরণ ফি দিতে হবে এবং আবেদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বিএসইসির কাছে আপিল করা যাবে। খসড়াটি চূড়ান্ত হলে নির্দিষ্ট শ্রেণির বড় ও যোগ্য কোম্পানির জন্য আইপিওর বাইরে সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন পথ তৈরি হবে।