থাইল্যান্ডে ৩ কোটি পরিবারের জন্য জাতীয় দুর্যোগ বীমা কর্মসূচি চালু
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটির সরকার প্রায় ৩ কোটি পরিবারের জন্য জাতীয় দুর্যোগ বীমা কর্মসূচি চালুর অনুমোদন দিয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের মন্ত্রিসভা এই কর্মসূচির অনুমোদন দেয়। বন্যা, ঝড় ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত অর্থ সহায়তা দেয়া এবং সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানোই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
থাইল্যান্ডে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষি ও ব্যবসার বড় ধরনের ক্ষতি হয়। দেশটির বন্যাপ্রবণ মধ্যাঞ্চল, রাজধানী ব্যাংকক ও আশপাশের নিচু এলাকা, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চল এবং কিছু ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১১ সালের ভয়াবহ বন্যাসহ গত দুই দশকে বিভিন্ন দুর্যোগে থাইল্যান্ডে মানুষের জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব দুর্যোগের পর ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দিতে সরকারকে বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন বাত (প্রায় ৯১ কোটি মার্কিন ডলার) পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়।
নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্যোগের পর শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর না করে আগেই আর্থিক প্রস্তুতি নিতে চায় থাইল্যান্ড সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, এই বীমা কর্মসূচির জন্য সরকার প্রতিবছর প্রায় ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন বাত (৪৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) ব্যয় করবে। এই অর্থ দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য দুর্যোগ বীমার সুরক্ষা কেনা হবে।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩ কোটি পরিবারকে বীমা সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কোন পরিবার কী ধরনের সুবিধা পাবে, তা নির্ধারণ করা হবে এলাকার দুর্যোগ ঝুঁকি, আগের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এবং ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে। বন্যাপ্রবণ এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
কর্মসূচির আওতায় দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত অর্থ সহায়তা পাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাত এবং ঝড় বা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৫ হাজার বাত দেয়া হবে। এই অর্থ দুর্যোগের ১৫ দিনের মধ্যে দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া কোনো বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সর্বোচ্চ ১ লাখ বাত পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ এবং দুর্যোগে পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে ২০ লাখ বাত পর্যন্ত লাইফ বীমা সুবিধা দেয়া হবে।
এই কর্মসূচিতে সরকার ও বেসরকারি বীমা কোম্পানি একসঙ্গে কাজ করবে। সরকার সাধারণ মানুষের জন্য বীমার অর্থের ব্যবস্থা করবে। আর বীমা কোম্পানিগুলো ক্ষতির তথ্য যাচাই, দাবি গ্রহণ এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করবে। বড় ধরনের দুর্যোগ হলে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলো নিজেদের ঝুঁকির একটি অংশ অন্য বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে পারে, যাকে পুনর্বীমা বলা হয়।
কোন কোন বীমা কোম্পানি এই কর্মসূচিতে যুক্ত হবে তা এখনো দেশটির সরকার চূড়ান্ত করেনি। তবে দেশটির সাধারণ বীমা খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এতে অংশ নিতে পারে। তাদের কাজ হবে দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা, ক্ষতির হিসাব করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় দুর্যোগ বীমা চালু হলে বড় দুর্যোগের পর সরকারের একসঙ্গে বিপুল অর্থ খরচের চাপ কমতে পারে। কারণ আগে থেকেই বীমার ব্যবস্থা থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং সরকারের আর্থিক পরিকল্পনাও সহজ হবে। তবে বীমা সরকারি সহায়তার বিকল্প নয়, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি অতিরিক্ত আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
বিশ্বের কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে দুর্যোগ বীমার কার্যকর ব্যবস্থা চালু করেছে। জাপানে ভূমিকম্পের ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ও বেসরকারি বীমা কোম্পানি একসঙ্গে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জাতীয় বন্যা বীমা কর্মসূচি রয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সরকার ও বীমা খাত একসঙ্গে কাজ করলে দুর্যোগের ক্ষতি সামলানো সহজ হয়। থাইল্যান্ডের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোকে দুর্যোগ বীমা চালুর বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার বীমা কোম্পানি ও উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় উপকূলীয় এলাকা, বন্যাপ্রবণ অঞ্চল এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহজ শর্তের ও কম খরচের দুর্যোগ বীমা চালুর সুযোগ রয়েছে।



