আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি আইএফআইসি ব্যাংকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনিয়োগ উপদেষ্টা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নতুন বোর্ড গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই বোর্ডের ওপর আবারও পর্যবেক্ষক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

তবে আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে প্রায় ৬৫.২৫ শতাংশ পৌঁছেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকের লুকানো বা নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত পুরোনো খেলাপি ঋণগুলো পুনরায় শ্রেণিবিন্যাস করা হলে এই উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।

ফলে আইএফআইসি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৬৫.২৫ শতাংশ। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১,২৯৫ কোটি টাকা।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন গঠিত পরিচালনা পর্ষদের অধীনে কোনো বড় ঋণ নতুন করে বিতরণ হয়নি। বর্তমানে যেসব ঋণ নতুন করে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলো মূলত আগের সরকারের সময়ে দুই বছর বা তার বেশি মেয়াদের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ দিয়ে বিতরণ করা ঋণ। ওই ঋণগুলোর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় স্বাভাবিক নিয়মেই সেগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন সফলতা পাওয়া যায়নি। কারণ অধিকাংশ ঋণখেলাপি পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন। এর ফলে খেলাপি ঋণ কমানো যাচ্ছে না।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩,৭৫৬ কোটি টাকা ছিল খেলাপি, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৮.৭২ শতাংশ। ওই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪,৩৮৯ কোটি টাকা বা ৯.৯২ শতাংশে দাঁড়ায়।

২০২৪-এর ডিসেম্বর প্রান্তিকে এক লাফে ১২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা বেড়ে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ১৭ হাজার ১৮২ কোটি টাকা বা ৩৮.৪৯ শতাংশে। এরপর ২০২৫ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের স্থিতি হয় ২৫ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা বা ৫৮.৩৯ শতাংশ। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৮১ কোটি টাকা বা ৬০.৬৭ শতাংশে।

এরপর সেপ্টেম্বর শেষে সামান্য কমে হয় ২৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বা ৬০.৬৩ শতাংশ। তবে নানা নীতি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বছরের শেষ প্রান্তিকে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আরো কমে। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা বা ৫৩.১২ শতাংশে।

চলতি বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আবার বাড়তে শুরু করে। আগস্ট শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বা ৬৫.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ আট মাসে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬,০৮১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ৪৫ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার ঋণ ছিল খেলাপির খাতায়, যা বিতরণ করা ঋণের ৬৩.৪৬ শতাংশ।

খেলাপি ঋণ উদঘাটনের পর সর্বোচ্চ ছিল ২৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বা ৬১.৪৭ শতাংশ। এরপর খেলাপি ঋণ কমার কথা থাকলেও বরং তা বেড়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা বা ৬৩.৩৮ শতাংশে। আর আগস্ট শেষে ছিল ২৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।

মুলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, সিকদার গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ ফেরত না আসায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বোঝা কমছে না।

জানা গেছে, ভুয়া নাম ব্যবহার করে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ২৮টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ফান্ডেড বা নগদ ঋণ ১২ হাজার ১৬৬ কোটি এবং নন-ফান্ডেড বা এলসি ও ব্যাংক গ্যারান্টি ১,০২০ কোটি টাকা। এসব ঋণকে বেনামি ঋণ বলা হয়। বর্তমানে এর পুরোটাই খেলাপি। গত ১৫ বছরে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। ঋণ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নির্মাণ, আবাসন, ট্রেডিং ও প্রকৌশল খাতের। এর সঙ্গে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

এছাড়া ব্যাংক থেকে বিতর্কিত ব্যবসায়ী নজরুল মজুমদারের মালিকানাধীন নাসা গ্রুপ নিয়েছে ১,৩৩৩ কোটি টাকা। জয়নুল হক সিকদারের মালিকানাধীন সিকদার গ্রুপ নিয়েছে ১,০৫৭ কোটি টাকা। বর্তমানে এসব ঋণের পুরোটাই খেলাপি। দীর্ঘদিন ব্যাংকটিতে অনিয়ম চলছিল। কিন্তু সালমান এফ রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় তার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এমনকি বিশেষ নিরীক্ষা করতেও বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নেয়নি। নিয়মিত নিরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়লেও তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির নতুন পরিচালনা পর্ষদ বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। এরপর বিশেষ নিরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরীক্ষকরা দীর্ঘদিন কাজ করে এসব তথ্য উদ্ঘাটন করেন।

ফলে অস্বাভাবিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ায় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণেও হিমশিম খাচ্ছে ব্যাংকটি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে এ ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ১১ কোটি টাকা। প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। জানা গেছে, গত জুন শেষে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭,১৯৯ কোটি টাকা। মার্চে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬,০১১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ছিল ৪,৭০৪ কোটি টাকা।

এদিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি এবং সুদ থেকে আয় না হওয়ায় ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ১,৬৬৮ কোটি টাকা। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে আইএফআইসির নিট লোকসান গত বছরের লোকসানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটি ২৫৬২ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে। অথচ ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, চব্বিশের ৫ আগস্টের পরপরই ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র উদঘাটিত হয়। এরপর ব্যাংকের দায়িত্ব ছিল খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক সূচকের উন্নতি করা। কিন্তু ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থায় উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি বোর্ড ও চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের ব্যর্থতারই প্রমাণ। আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে।

৫ আগস্টের পর একপর্যায়ে ব্যাংকটির আমানত কমে ৪৩ হাজার কোটি টাকায় নেমে যায়। বর্তমানে আমানত ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ৮১-৮২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ঋণ বিতরণ সংকুচিত থাকায় খেলাপি ঋণের হার শতাংশের হিসাবে দ্রুত কম না দেখালেও সার্বিক ঋণ আদায় ও আমানতের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ জানতে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মনসুর মোস্তাফাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।