মাসুদ খান কমিশনে ডুবছে পুঁজিবাজার, আড়াই মাসে সূচক উধাও ৬২০ পয়েন্ট
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় পুঁজিবাজারে চলছে রক্তক্ষরণ। আর অস্থিরবাজারে প্রায় প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক। এর চেয়েও বেশি কমছে শেয়ারের দাম। আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকেই যে কোনো মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। তাতে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে।
দেখে মনে হচ্ছে পুঁজিবাজার যেন এক আতঙ্কের নাম। ফলে সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে দিন যতই যাচ্ছে, বাজার নিয়ে হতাশাও তত বাড়ছে। এরপরও পতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা উঠে গেছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন দেশের পুঁজিবাজার হাটঁছে কোন পথে। আমাদের দেখার মতো কি কেউ নেই। ধারাবাহিক পতনে দিনে দিনে হারিয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি। এমনকি টানা দরপতনে চলছে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ। এছাড়া ডুবতে থাকা পুঁজিবাজার টেনে তুলবে কোন কান্ডারী? ফলে দেশের পুঁজিবাজারে দরপতনের ধারা যেন থামছেই না। টানা দরপতনে গত আড়াই মাসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৬২০ পয়েন্ট কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। গত আড়াই মাসে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ উধাও হয়ে গেছে।
তবে গত জুন মাসে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন মাসুদ খান। মুলত দায়িত্ব পাওয়ার ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কতটুকু সফল হয়েছেন এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে।
বরং বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা আবারও ভারী হচ্ছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও বিনিয়োগ করা পুঁজি হারানোর শঙ্কা পেয়ে বসার পাশাপাশি আস্থার সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে ক্রমান্বয়ে ডুবতে বসেছে পুঁজিবাজার।
অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার মাসুদ খানসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন সহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ধ্বংসের দারপ্রান্তে। বিশেষ করে বাজারকে স্থিতিশীল করতে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে কারসাজির ইস্যূগুলো ছোট ছোট ভুল ত্রুটিকে সামনে এনে বড় অঙ্কের জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তির মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক বিক্ষোভ ও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতার পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। এছাড়া একের পর এক জরিমানা ইস্যুতে বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীরা বাজারবিমুখ হয়ে পড়ছেন। তেমনি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এর ফলে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে।
একই সঙ্গে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ চলছে। ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটেছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়েছেন।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, এমনিতেই বাজার মন্দার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে গার্মেন্টেসের নূন্যতম মজুরি নিয়ে সৃষ্টি হওয়া অস্থিতিশীল অবস্থা পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও এর ঘটনা ঘটনায় সবার মধ্যেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে। যে চাপ বাজার নিতে পারছে না। এজন্যই পুঁজিবাজারে দরপতন হচ্ছে।
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে। বর্তমান সরকারের আট মাসের মধ্যে এত বড় শ্রমিক আন্দোলন হবে তা প্রত্যাশিত ছিল না। তবে শ্রমিকদের দাবিও অযৌক্তিক নয়। রাজধানী ঢাকায় এমন আন্দোলন হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বেও পড়তে পারে। এছাড়া পুঁজিবাজারে চাপ তৈরির পেছনে শ্রমিক আন্দোলনের চেয়েও বড় কারণ হলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ব্যাংকে গিয়েও অনেকে প্রয়োজনমতো টাকা পাচ্ছেন না। এ কারণে মানুষ হাতে নগদ টাকা রাখতে চাইছে। তেমনি নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার থেকে কিছু বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। তারা হাতে নগদ টাকা রেখে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এসব কারণেও বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে ডিএসই প্রধান মূল্যসূচক ৫ মাস আগের অবস্থানে চলে গেছে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসের ২৩ তারিখ ডিএসইএক্স সূচক ছিলো ৫ হাজার ৩২৮ পয়েন্টে। আর মঙ্গলবার দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৮৪ পয়েন্টে। এদিন সূচকের সাথে কমেছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। তবে টাকার পরিমানে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৮৪ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ৩০ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ২০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ২১ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৮৬ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৬৮ টির, দর কমেছে ২৬৭ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৫১ টির। ডিএসইতে ৫৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৪১৮ কোটি ২২ লাখ টাকার ।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২১৪ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৮১ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৪৫ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১২ টির এবং ২৪ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



