স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে কিউআর কোডের মাধ্যমে জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর দুটি ফিলিং স্টেশনে এই সেবা চালু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সচিবালয়ে সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, তাদের আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের উদ্যোগে তৈরি এই অ্যাপটি প্রথম পর্যায়ে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনে এটি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাইলটিং সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব ধরনের যানবাহনের জন্য এটি চালু করা হবে। বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানি বিতরণের কারণে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট ও লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থাটি চালু করা হয়েছে। ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা হবে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা যাবে। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি কিউআর কোড তৈরি হবে। ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় কোড স্ক্যান করলেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়া যাবে।

ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে জ্বালানির বরাদ্দ নথিভুক্ত করবেন। চালকরা কিউআর কোড স্ক্যান করে জ্বালানি গ্রহণ ও নিজেদের বরাদ্দ দেখতে পারবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে পুরো দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এছাড়া যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে কিউআর কোড ডাউনলোড করে প্রিন্ট ব্যবহার করতে পারবেন।

নতুন এই ব্যবস্থাটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। জ্বালানি বিভাগ আশা করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম ও অপচয় কমবে এবং সংকটের সময় কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সহযোগিতায় দ্রুত এই ব্যবস্থা দেশব্যাপী চালু করা যাবে বলেও জানানো হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পেয়ে ও দীর্ঘ সময় লাইন ধরে থাকা নিয়ে কোন কোন পাম্পে ঘটেছে মারামারি, বিশৃঙ্খলা। নড়াইলে গত ২৮ মার্চ তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

কোথাও কোথাও পাম্পে অকটেন-পেট্রোল না থাকার নোটিশ এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগও সামনে এসেছে। নতুন সেবা জ্বালানি বিভাগ বলছে, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানি বিক্রির কারণে কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইন, যানজট, একই ব্যক্তি বা যানবাহনের একাধিকবার জ্বালানি নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

‘ফুয়েল পাস’ চালু হলে পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া ‘ডিজিটাল রেকর্ডে’ আসবে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তাৎক্ষণিক নজরদারি করা যাবে। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে গত ২৯ মার্চ ফিলিং স্টেশনগুলোতে নজরদারির জন্য ‘ট্যাগ কর্মকর্তা’ নিয়োগের কথা জানায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরদিন সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই; বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনার প্রবণতাই লাইনের চাপ বাড়িয়েছে। এরপর ২ এপ্রিল জ্বালানি বিভাগ জানায়, অবৈধ মজুদ ঠেকানো ও সরবরাহে শৃঙ্খলা ফেরাতে সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করা হবে।

জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘ফুয়েল পাস’ চালু হলে জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়বে, অপচয় ও অনিয়ম কমবে এবং সংকটের সময় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। জ্বালানি সংকটের মধ্যে দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ডিজেল-অকটেন-পেট্রোল সরবরাহে অনিয়ম এবং মজুতের প্রবণতা দেখা যায়। এর প্রেক্ষিতে সরকার সারাদেশে অভিযান শুরু করে।

গত ৩ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৭ হাজার ৩৪২টি অভিযান পরিচালনা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব অভিযানে ৩ হাজার ১১টি মামলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৩৬ জনকে। অভিযানে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৭ লিটার ডিজেল, ৩৬ হাজার ৬২১ লিটার অকটেন, ৮০ হাজার ৩৭৪ পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে।