আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাত ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতার খবরে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।

আজ সোমবার সকালের লেনদেনে জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক নিক্কেই ২২৫ পাঁচ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। নিয়মিত বাজার সময়ের বাইরে লেনদেন হওয়া মার্কিন শেয়ারবাজারের ফিউচারসও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার প্রায় ১ শতাংশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক ফিউচার ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে এই চুক্তির খবরের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর মূল্য ৪ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৩ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে এসেছে।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে পৌঁছানো নতুন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এই সমঝোতাকে অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত। আজ সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আন্তোনিও কস্তা বলেন, আমি এই ব্যয়বহুল যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতার পূর্ণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় রয়েছি।

এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি জনগণের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে হয়েছে।

একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেওয়া হবে। এর আগে সেখানে পাতা মাইন অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রণালিটি স্বাভাবিক হলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে এবং তেল পরিবহন পুনরায় শুরু হবে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এই পথ চালু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমঝোতার খবর প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৬৫ ডলার বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৩ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ৭৫ ডলারে দাঁড়ায়।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে চাপ কমবে। ফলে জ্বালানি মূল্য আরও স্থিতিশীল হতে পারে। সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া এবং হংকংয়ের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

মার্কিন বাজারেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসদাক সূচকের ফিউচার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনায় মার্কিন ডলারও অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমে আসা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা তেলের দাম ও ডলার—দুটোকেই নিচের দিকে নিয়ে গেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা কমেছে।

যদিও সমঝোতার খবর বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তবু পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হরমুজ প্রণালিতে এখনো মাইন রয়েছে। সেগুলো অপসারণ না করা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে নৌ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে না। বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজমালিকদের সংগঠন বিমকোর নিরাপত্তা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেনের মতে, মাইন অপসারণে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এ ছাড়া যুদ্ধের সময় প্রণালিতে আটকে থাকা শত শত তেলবাহী জাহাজ একসঙ্গে চলাচল শুরু করলে সাময়িকভাবে যানজট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। যুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব ক্ষেত্র আবার পুরো সক্ষমতায় চালু করতে সময় লাগবে।

এ ছাড়া তেল সংরক্ষণাগারগুলোও প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন বাড়ানো সহজ হবে না। অনেক ক্ষেত্রেই তেলক্ষেত্র বন্ধ করার পর পুনরায় চালু করলে আগের মতো উৎপাদন পাওয়া যায় না। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং মেরামতের কাজও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিছু ক্ষেত্রে পূর্ণ পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে চুক্তি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি কতটা স্থায়ী হয় তার ওপর।

যদি যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে এবং হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে চালু হয়, তাহলে তেলের দাম স্থিতিশীল হবে, বৈশ্বিক বাণিজ্য গতি পাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। তবে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে।