দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: কীটনাশকের মান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ দেশে নতুন কিছু নয় নিম্নমানের পণ্য আমদানি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বাজারজাত কিংবা ভেজাল মেশানোর ঘটনা মাঝেমধ্যেই আলোচনায় আসে। তবে এবার সামনে এসেছে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ সরকারি নিবন্ধন প্রক্রিয়াই জাল করে দীর্ঘদিন ধরে কীটনাশক বিক্রি করে আসার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এতে দেশের কীটনাশক নিবন্ধন ও বাজার তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক দশক ধরে জেনারেল এগ্রো কেমিক্যাল লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান আধা ডজনের বেশি কীটনাশক ব্র্যান্ড বাজারজাত করে আসছে, অথচ এসব পণ্যের কোনো বৈধ নিবন্ধন নেই। এর পরিবর্তে ভুয়া বা জাল নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে পণ্যগুলো বাজারে ছাড়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কীটনাশক নিবন্ধনের সময় প্রতিটি পণ্যের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ অনুমোদন শনাক্তকারী নম্বর দেওয়া হয়, যা কেবল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটি তাদের একাধিক পণ্যের বিপরীতে এমন নম্বর ব্যবহার করছে, যা তাদের নিজেদের নয় বলে জানা গেছে। এমনকি এসব পণ্যের ক্ষেত্রে কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির কোনো অনুমোদনও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ শাখা প্রতিটি ব্র্যান্ডের বিপরীতে লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন করে, তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের সুপারিশ আসে একটি কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির কাছ থেকে। অভিযোগ অনুসারে, ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নম্বর ব্যবহার করেই সনদ জালিয়াতি করেছে অভিযুক্ত কোম্পানিটি।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, সব ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক না থাকলে এতদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। তার দাবি, ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেই কেউ এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তবে অনুমোদনের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে অনুরোধ করা হলে তিনি তা প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অতীতে কীটনাশক নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়া হাতে-কলমে সম্পন্ন হতো, যা বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে এমন জালিয়াতির তথ্য একে একে সামনে আসতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলে এই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি এবং এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকিতে ব্যাপক পরিমাণে নিম্নমানের কীটনাশক শনাক্ত হচ্ছে এবং ভেজাল কীটনাশকের প্রবণতাও ক্রমাগত বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে ডজনখানেকের বেশি কীটনাশক পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সামগ্রিকভাবে এই ঘটনা কৃষি উপকরণ খাতে নিবন্ধন যাচাই ও বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে ভবিষ্যতে কৃষকরা নিরাপদ ও মানসম্মত কীটনাশক ব্যবহারের নিশ্চয়তা পান।