দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজের দুই উদ্যোক্তা পরিচালক কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই নিজেদের হাতে থাকা ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৬০টি শেয়ার বিক্রি করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তাদের বিও হিসাব খোলার ফরমেও কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালক পরিচয় উল্লেখ ছিল না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ ঘটনায় দুই পরিচালক এবং তাদের শেয়ার লেনদেনের দায়িত্বে থাকা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান মো. ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিধিবিধান লঙ্ঘনের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই পরিচালক এম এফ কামাল ও কবির আহমেদ গত ২২ জানুয়ারি ব্লক মার্কেটে তাদের সব শেয়ার বিক্রি করেন। এর মধ্যে এম এফ কামাল বিক্রি করেন ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০টি এবং কবির আহমেদ ৩ লাখ ২৮ হাজার ৪৬০টি শেয়ার। দুই ভাইয়ের বিক্রি করা শেয়ারের গড় দাম ছিল ১৪ টাকা ৫০ পয়সা। এতে তারা মোট পান ১ কোটি ২৮ লাখ ২ হাজার ৯২০ টাকা।

তদন্তে দেখা যায়, শেয়ারগুলোর গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৯ টাকা ৬ পয়সা। সব শেয়ার বিক্রি করে দুই পরিচালক ১ কোটি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬৮ টাকা ৬২ পয়সা মূলধনি লোকসান করেন। শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা, যা ক্রয়মূল্যের ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ। বিক্রির পর তাদের হাতে কোম্পানিটির কোনো শেয়ার অবশিষ্ট ছিল না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২২ জানুয়ারি মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের ব্লক ও পাবলিক মার্কেট মিলিয়ে মোট ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৫২২টি শেয়ার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দুই পরিচালকের বিক্রি করা শেয়ারের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৬০টি, যা ওই দিনের মোট লেনদেনের ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ। দিন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়ায় ১৫ টাকা ১০ পয়সা, আগের দিনের তুলনায় যা ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।

ডিএসই চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করে। এ সময়ে মোট ৬৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৭০টি শেয়ার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দুই পরিচালকের বিক্রি করা শেয়ারের পরিমাণ ছিল মোট লেনদেনের ১৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তদন্তের সময়সীমায় শেয়ারটির দাম ১০০ শতাংশ বেড়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ কার্যদিবসে শেয়ারটির দাম ছিল ২৫ টাকা ২০ পয়সা।

ডিএসইর তদন্তে বলা হয়েছে, এম এফ কামাল ও কবির আহমেদ মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের উদ্যোক্তা পরিচালক। তারা মো. ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজের গ্রাহক। কিন্তু তাদের বিও হিসাব খোলার ফরমে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। শেয়ার বিক্রির আগেও তারা ডিএসই বা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) কোনো ঘোষণা দেননি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডিএসই ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়। তবে কোম্পানিটি প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেনি। ডিএসইর মতে, আগাম ঘোষণা না দিয়ে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে দুই পরিচালক বিএসইসির ২০১০ সালের ১৪ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপন, ডিএসইর তালিকাভুক্তি বিধিমালার ৩৪(১) ধারা এবং বিএসইসির ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির আদেশ লঙ্ঘন করেছেন। এ ছাড়া বিও হিসাব খোলার ফরমে উদ্যোক্তা পরিচালক পরিচয় উল্লেখ না করায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৮ ধারার লঙ্ঘন হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে মো. ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজ এবং প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনে গাফিলতির তথ্যও পাওয়া গেছে। ডিএসই বলেছে, গ্রাহকের হিসাব খোলার সময় প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথভাবে যাচাই ও সংরক্ষণ করা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।

এ ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বিধিমালা, ২০২০-এর ৫(২)(ঙ) বিধি, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের উপবিধি ৭.৩.৩ এবং ডিপোজিটরি (ব্যবহারিক) প্রবিধানমালা, ২০০৩-এর ২৬(১) বিধি লঙ্ঘনের কথা বলেছে ডিএসই। এ ছাড়া স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি বিধিমালা, ২০০০-এর ১১ বিধিরও ব্যত্যয় ঘটেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।

ডিএসইর কাছে দেওয়া জবাবে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানটি জানায়, লেনদেনের সময় এম এফ কামাল ও কবির আহমেদ যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক, তা তারা জানত না। এ বিষয়ে গ্রাহকরাও তাদের কোনো তথ্য বা ঘোষণা দেননি। প্রচলিত নিয়ম, প্রাপ্ত তথ্য এবং গ্রাহকের নির্দেশনার ভিত্তিতেই লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও পরিপালন ব্যবস্থা জোরদারের কথাও জানিয়েছে তারা।

এদিকে মেঘনা কনডেন্সড মিল্কের শেয়ারে সন্দেহজনক কারসাজিমূলক লেনদেনের বিষয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিএসইকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসই গত ৫ এপ্রিল বিডি সানলাইফ সিকিউরিটিজ ও মো. ফখরুল ইসলাম সিকিউরিটিজকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহীদের বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক করে।