পুঁজিবাজারে বড় উত্থানের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালে সূচক যাবে ১০ হাজার!
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতা থেকে পুনরুদ্ধার এবং পরবর্তী সময়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিকে এগোলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০ হাজার পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ক্যাপিটাল অ্যালায়েন্স (সিএএল) বাংলাদেশ।
ফ্রন্টিয়ার মার্কেটকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ব্যাংক সিএএল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ম্যাক্রো আউটলুক ২০২৬-৩০’শীর্ষক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘Shifting Gears’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে ডিএসইএক্সের ৫ হাজার ৮৯৬ পয়েন্টের অবস্থান থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ২০২৭ সালের শেষে সূচকটি ১০ হাজার পয়েন্টে উঠতে পারে। সিএএল বাংলাদেশের মতে, শক্তিশালী করপোরেট আয়, সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতি, সুদহার কমে আসা এবং পুঁজিবাজারের মূল্যায়ন বাড়ার সম্ভাবনা—এই চারটি বিষয় বাজারকে বড় ধরনের ঊর্ধ্বমুখী গতি দিতে পারে।
প্রতিবেদনে ৪৫০টির বেশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও বাজার সূচক বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ডিএসইএক্সকে ১০ হাজার পয়েন্টে নিতে বাংলাদেশের কোনো ‘অর্থনৈতিক বিস্ময়’ প্রয়োজন হবে না। বরং অর্থনীতিতে ঐতিহাসিক প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরে আসা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লেই বাজারে বড় ধরনের পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কোম্পানিগুলোর করপোরেট আয় বছরে প্রায় ২৬ শতাংশ বাড়তে পারে। মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পেলে বিক্রি বাড়বে, উৎপাদন সক্ষমতার অব্যবহৃত অংশ কাজে লাগানোর মাধ্যমে পরিচালন মুনাফা বাড়বে এবং সুদহার কমে যাওয়ায় অর্থায়ন ব্যয় কমবে—এসব কারণে কোম্পানির আয় বাড়বে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও বর্তমানের প্রায় ১০ দশমিক ৪ গুণ থেকে বেড়ে ২০২৭ সালের শেষে ১৪ গুণে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সিএএলের মতে, করপোরেট আয়ের প্রবৃদ্ধি এবং বাজারের মূল্যায়ন এই দুইয়ের সমন্বয়ই ডিএসইএক্সকে ১০ হাজার পয়েন্টে পৌঁছানোর প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাব্য দ্রুত সম্প্রসারণের পেছনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো: জনসংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মুদ্রানীতিতে শিথিলতা।
সিএএল বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ কর্মশক্তিতে যুক্ত হচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মাসে ৩২৫ ডলারের বেশি আয় করা মধ্যম আয়ের পরিবারের সংখ্যা ২৮ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে দেশে ভোগ্যপণ্য ও সেবার চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, দেশের শিল্পখাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অব্যবহৃত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। জ্বালানি সংকট ও উচ্চ ঋণব্যয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের বিদ্যমান সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। এসব বাধা কমে এলে নতুন করে বড় বিনিয়োগ না করেই উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, যা কোম্পানিগুলোর মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। মুদ্রানীতিতে শিথিলতাকেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালক হিসেবে দেখছে সিএএল। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতিসুদ কমিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, সামনে আরও সুদহার কমানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ১২ শতাংশের ওপরে থাকা ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার ২০২৭ সালের জুন নাগাদ কমে ৭ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সুদহার কমলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়বে, যা অর্থনীতির পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে সিএএল।
সিএএলের মতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের অর্থনৈতিক সংশোধনপর্ব অনেকটাই পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। অর্থের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত রয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। এ ছাড়া দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা লেনদেন ভারসাম্য উদ্বৃত্তে ফিরেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা এসেছে। ফলে বিনিয়োগের পরিবেশ আগের তুলনায় অনুকূল হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জুন নাগাদ ডলারের বিপরীতে টাকা ১২৫ থেকে ১২৭ টাকার মধ্যে থাকতে পারে। এতে টাকার অবমূল্যায়ন মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরলে দীর্ঘদিন দূরে থাকা বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ফেরার আগ্রহ দেখাতে পারেন বলে মনে করছে সিএএল।
সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পরিণত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো কয়েকটি অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে মাথাপিছু জিডিপি ৪ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। ফলে দেশের ভোক্তাদের মধ্যে সাধারণ পণ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ও প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের চাহিদাও বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর বড় অংশ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বা নির্মাণাধীন রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৮ গিগাওয়াট হতে পারে। পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনছে।
তবে বাজার নিয়ে আশাবাদী হলেও বেশ কিছু ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছে সিএএল। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যে বড় ধরনের ধাক্কা এলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং সুদহার কমানোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি ও অন্যান্য অমীমাংসিত সমস্যা অর্থনীতির সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। দেশের জ্বালানি সংকটও শিল্পকারখানার বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সিএএল বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের জন্য ‘Accumulate Stocks’ বা ধাপে ধাপে শেয়ার সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব ঝুঁকি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সময়কে পিছিয়ে দিতে পারে, তবে সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের প্রবণতা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার পুরোপুরি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই যারা বাজারে অবস্থান নেবেন, তারা পুঁজিবাজারের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপ থেকে তুলনামূলক বেশি লাভবান হতে পারেন।



