ডিএসইর তদন্ত-চিঠি-ফোন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে আতঙ্ক
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনের পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) গত এক মাসে ৩৬৪ পয়েন্টের বেশি সূচক কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।
এছাড়া বিনিয়োগ নিয়ে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে তদন্তে চাপে পড়েছে পুঁজিবাজার। বড় অঙ্কের শেয়ার কিনলেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ফলে অর্থপ্রবাহ কমে গেছে পুঁজিবাজারে। এর প্রভাবে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এতে টানা পতনের মুখে পড়েছে পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে আবারও প্রশ্ন উঠেছে বাজারের এই দুরবস্থার জন্য কী নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ দায়ী। নাকি মূল সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট?
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সার্ভিল্যান্স বিভাগ থেকে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে ঝটিকা অভিযান বা তদন্ত করা হচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই। বিভিন্ন ব্রোকারেজ মালিকরা বলছেন, বড় কোনো ক্রয়াদেশ বা বিক্রয়াদেশ দিলেই বিএসইসি বা ডিএসইর পক্ষ থেকে কারণ জানতে চাওয়া হয়। এমনকি সরাসরি তদন্ত করে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়ম, কারসাজি ও দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স বন্ধে নিয়ন্ত্রকের কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের এমন একটি পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা জানবেন-নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না এবং সব কোম্পানির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাজারের বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত কারণ হলো ডিএসইর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে পুঁজিবাজারে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। তেমনি জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, শিল্প-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি অন্যতম।
তারা বলছেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। নানান অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে মন্দা চলছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক দুর্বল কোম্পানির আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছত্রছায়ায় কারসাজি চক্র বাজার থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ তুলে নেয়। কারসাজি চক্রকে সুযোগ করে দিতে একাধিকবার বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়। এতে ওই চক্র লাভবান হলেও দুর্বল হয়ে পড়ে পুঁজিবাজারের ভিত্তি। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে বাজারে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় পুঁজিবাজার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা আরও প্রকট হয়। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক পুঁজিবাজার বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
ফলে বিনিয়োগকারীদের মারাত্মক আস্থার সংকটে খাদের কিনারায় চলে যায় পুঁজিবাজার। ডিএসইর প্রধান সূচক পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে।
দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে যায়, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে সূচকটি ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে উঠে আসে। তবে আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকেই সূচক ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী ছিল। গত ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে থাকলেও ৮ সেপ্টেম্বর এসে দাঁিড়য়েছে ৫ হাজার ৫৩৯ পয়েন্ট।
তবে গত জুলাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্কারের প্রত্যাশায় ডিএসইএক্স এক দিনে ৪৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টে উঠেছিল এবং লেনদেন প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায় পৌঁছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রকের প্রতি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা বাজারে অর্থ আনতে পারেন এটিও স্পষ্ট। অন্যদিকে বর্তমানে সেই আস্থা আবার দুর্বল হয়েছে। নতুন বিএসইসি নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই বাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির দুর্বল অবস্থার বিষয়টি সামনে আসে।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকেই অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন। ফলে বাজারে ক্রয়চাপের তুলনায় বিক্রির চাপ বাড়ছে এবং লেনদেনও কাঙ্খিত গতি পাচ্ছে না। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক কমেছে ১০৪ পয়েন্ট। এমন বড় পতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বিনিয়োগকারী আ.ন.ম. আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি বারবার নিয়ম পরিবর্তন করে তাহলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নতুন কমিশন গঠনের পর যদি আগের নিয়ম পরিবর্তন করে তাহলে বাজারে আস্থা কীভাবে ফিরবে। কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপকে যদি বেশি সুবিধা দিতে চায় বা কোনো গ্রুপকে যদি চাপে ফেলতে চায় তাহলে বাজার কখনোই সঠিক পথে চলবে না। বিনিয়োগকারীকে সুরক্ষা দিতে হবে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে। কোনোভাবে পরিচয়কেন্দ্রিক আচরণ করা বাজারের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসতে পারে না।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চিত্র শুধু শেয়ারের দর কমার নয়; বরং বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে বাজারে যে লেনদেন হচ্ছে, তার বড় অংশই নতুন অর্থের প্রবাহ নয়। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের এক শেয়ার থেকে অন্য শেয়ারে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে। ফলে বিক্রির চাপ সামাল দেওয়ার মতো নতুন ক্রেতা ও নতুন অর্থ বাজারে আসছে না।
এ বিষয় জানতে চাইলে ডিএসইর সাবেক পরিচালক আহমেদ রশীদ লালী বলেন, পুঁজিবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ বাজারকে অস্থিতিশীল করবে। মানুষ আস্থা পাবে না। কোনো বিনিয়োগকারী যদি বড় একটি ক্রয়াদেশ দেয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়। কেন এমন ঘটনা ঘটবে। কোনটা অনিয়ম সেটা জানতে হবে আগে।
বাজারে বিনিয়োগ করতে গিয়ে যদি আতঙ্ক বোধ করে তাহলে কেন বিনিয়োগ করবে? তিনি আরও বলেন, বাজারে দীর্ঘদিন আইপিও নেই। এখন নতুন বিধিমালা জারি করেছে। আশা করি দ্রুত বাজারে আইপিও আসবে। নতুন বিনিয়োগকারী আসবে। তাতে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।



