আস্থা ও তারল্য সংকটে হাহাকার পুঁজিবাজার, সূচকের বড় দরপতন
শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে টালমাতাল আচরণে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বিনিয়োগকারীদের। ফলে টানা দরপতনে চলছে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ। আর অস্থিরবাজারে প্রায় প্রতিদিনই কমছে মূল্যসূচক। এরচেয়েও বেশি কমছে শেয়ারের দাম। আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীদের অনেকেই যে কোনো মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। তাতে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়ে গেছে। ফলে দেখে মনে হচ্ছে পুঁজিবাজার যেন এক আতঙ্কের নাম।
তবে সূচকের টানা দরপতন হলেও বাজার ইস্যুতে বিএসইসি ও ডিএসইর নিরব ভুমিকা পালন করছেন। ফলে আস্থা ও তারল্য সংকটে হাহাকার হয়ে পড়ছে পুঁজিবাজার। এ অবস্থায় বাড়ছে ক্রেতা সংকটের হিড়িক। মুলত দেশের পুঁজিবাজার যেন দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে।
রাজনৈতিক সরকার বদলেছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে এসেছে নতুন মুখ, নতুন বাজেটেও পুঁজিবাজারের গতি ফেরাতে বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব ও ইতিবাচক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু তারপরও পুঁজিবাজারে কাঙ্খিত গতি ফিরছে না। ফলে লেনদেন খরা দেখা দিয়েছে পুঁজিবাজারে।
তবে বড় ধসের পর এক কার্যদিবস পুঁজিবাজারে মূল্যসূচক কিছুটা বাড়লেও সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচক বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। এদিন ডিএসইর সূচকের সাথে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর কমেছে। তবে টাকার পরিমাণে লেনদেন কিছুটা বেড়েছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার মাধ্যমে। ফলে লেনদেনের শুরুতে সূচকের ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মেলে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ায় এক পর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬১ পয়েন্ট বেড়ে যায়। ফলে বাজারে পতন কেটে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফেরার স্বপ্ন দেখতে থাকেন বিনিয়োগকারীরা।
তবে সায়হাম টেক্সটাইলের ডিএসইর তদন্তের খবরে দুপুর ১২টার পর এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা বাজারে মাত্রাতিরিক্ত বিক্রির চাপ বাড়ান। বিপরীতে কমে ক্রেতার পরিমাণ। ফলে দেখতে দেখতে দাম বাড়ার তালিকা থেকে দাম কমার তালিকা বড় হয়ে যায়। সেই সঙ্গে বড় উত্থান থেকে পতন দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
এনবিএল সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিছুদিন বাজার বাড়ায় সেই আস্থাও ফিরছিল। কিন্তু আবার টানা দরপতনে আমরা উদ্বিগ্ন। এক দিনে ১০৪ পয়েন্টের বেশি পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরুক এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, পতনের সময় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী থাকলে বাজারকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে ধরে রাখা সহজ হতো। কিন্তু দেশে সেই ধরনের ক্রেতার ঘাটতি থাকায় দরপতন শুরু হলে তা অনেক সময় বড় আকার নেয়। তবে দেশে জ্বালানি ও গ্যাস পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এর সঙ্গে বাজারে কিছু পরিচিত কারসাজিকারীর লেনদেন নিয়ে তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়ার আলোচনা থাকলেও এর সত্যতা নিশ্চিত নয়। বিএসইসির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কোনো শেয়ারের অস্বাভাবিক দর ওঠানামা হলে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে তথ্য নেওয়া রুটিন কাজ। তবে বর্তমানে বিএসইসি থেকে নির্দিষ্টভাবে এমন কোনো তথ্য নেওয়া হচ্ছে না।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২৮ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৫৩৯ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১০৯ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৫ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ১০৮ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৬ টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৮৩ টির, দর কমেছে ২৫২ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৬১ টির। ডিএসইতে ৫৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা বেশি। আগের কার্যদিবস লেনদেন হয়েছিল ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৩ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৯২৩ পয়েন্টে। সিএসইতে ২০১ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৮২টির দর বেড়েছে, কমেছে ৯৫টির আর ২৪টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



