ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৯৯ হাজার কোটি টাকা
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংক খাতের ক্যান্সার খ্যাত খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকার অংক। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের সংকট যেন কোনোভাবেই কাটাতে পারছে না কয়েকটি ব্যাংক। বরং বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ জমা হচ্ছে অল্প কয়েকটি ব্যাংকে। ২০২৬ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪১২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এই তিন ব্যাংকের খেলাপি ঋণই দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মোট খেলাপির মধ্যে যা প্রায় ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এক ব্যাংকেই প্রায় এক লাখ কোটি তালিকার শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের শেষেও ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। তখনই এটি দেশের কোনো একক ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের রেকর্ড গড়ে।
জুনে দেওয়া আপনার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা হয়েছে। এদিকে ব্যাংকটির তারল্য সংকটও প্রকাশ্যে এসেছে। জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে কয়েক দফায় তারল্য সহায়তা দিয়েছে; এক পর্যায়ে তিন দিনে ব্যাংকটি মোট ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা পায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বড় ধাক্কা খেলাপি ঋণের তালিকায় বড় জায়গা দখল করে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আপনার তথ্য অনুযায়ী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যথাক্রমে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি এবং ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য উদ্ধৃত করে ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ৩০ জুন জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকের ২৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিভিন্ন রিপোর্টিং/ডেটাসেটের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক জনতা, অগ্রণী, রূপালী, সোনালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক মিলে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এর অর্ধেকের বেশি একাই জনতা ব্যাংকের।
শুধু শীর্ষ ১০ ব্যাংক নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চের তুলনায় তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা এখন খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত।
ঋণ অনুমোদন ও আদায় নিয়ে প্রশ্ন খেলাপি ঋণের এই পরিমাণ ব্যাংকগুলোর ঋণ অনুমোদন, বড় গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ঋণের যথাযথ ব্যবহার যাচাই এবং আদায় প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে যখন অল্প কয়েকটি ব্যাংকেই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তখন শুধু খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা হিসাব সমন্বয় না করে কারা কীভাবে ঋণ নিয়েছে, কোন জামানতের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে, ঋণের অর্থ কোথায় গেছে এবং কেন সময়মতো আদায় হয়নি-এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মূখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণ যত বাড়বে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধনের ওপর চাপ তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে আমানতকারী, ব্যাংকের তারল্য এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর।



