বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজার পতনের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ১৬ বছরে পুঁজিবাজার ছেড়েছে প্রায় ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। আর এক দশকের বেশি সময়ে পুঁজিবাজার সংকুচিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বছর পনেরো আগে পুঁজিবাজারে বড় ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ড. এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন কমিশন গঠন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

দীর্ঘ ৯ বছর দ্বায়িত্বে থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয় সেই কমিশন। শুধু খায়রুল কমিশন নয়, এরপর বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও রাশেদ মাকসুদের কমিশনের অধীনে পুঁজিবাজার সংস্কারের অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বিনিয়োগকারীদের মাঝে কাঙ্খিত আস্থা ফেরাতে পারেনি।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) নেতৃত্বের পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত দেড় দশকে বারবার চেয়ারম্যান ও কমিশন বদলেছে, বদলেছে প্রতিশ্রুতির ভাষা, পরিবর্তনের অঙ্গীকার এবং সংস্কারের রূপরেখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো: পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরেনি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম, কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে দেশের পুঁজিবাজার এক গভীর আস্থাহীনতার সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে।

ফলে খায়রুল কমিশন গেছে, শিবলী কমিশন গেছে, রাশেদ মাকসুদ কমিশনও গেছে। এখন দায়িত্বে মাসুদ খান নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন। এক কমিশনের পর আরেক কমিশন এসেছে, পরিবর্তন হয়েছে আইন ও বিধিবিধানে, এসেছে নতুন নতুন সংস্কারের উদ্যোগ। এর মধ্যে সরকারও বদলেছে। কিন্তু পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের ভাগ্যে বদলায়নি।

বর্তমান মাসুদ কমিশনের নানা উদ্যোগ ও সংস্কার আর বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর নানা আশ্বাসের মধ্যেও পুঁজিবাজারের অস্থিরতা কাটছে না। বরং টানা দরপতনে আবারও তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে সূচক। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২২ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত ৮ জুন সূচকটি ৫ হাজার ৪৮২ পয়েন্টে ছিল।

মুলত পুঁজিবাজারের টানা দুর্বলতার পেছনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে। দীর্ঘদিনের দরপতন, লেনদেনে খড়া, নানা কোম্পানির অনিয়ম নিয়ে তদন্ত, অর্থনীতি ও ব্যবসার অনিশ্চয়তা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বাজারে সতর্কতা বাড়িয়েছে।

অথচ চলতি বছরের শুরুতে বাজারের চিত্র ছিল অন্য রকম। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বছরের শুরুতে ডিএসইএক্স ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে। এরপর কয়েক মাসে সূচক ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে আসে। এতে দীর্ঘদিনের লোকসান কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন অনেক বিনিয়োগকারী। কিন্তু সেই আশার জায়গা এখন আবার অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। এক মাসের কাছাকাছি সময় ধরে টানা পতনে সূচক নেমে এসেছে ৫ হাজার ৫৪৪ পয়েন্ট।

এ সময়ে বাজার ঠিক করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মার্জিন বিধিমালায় পরিবর্তন, সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা নিয়ে কাজ, বাজার নজরদারি জোরদারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সরাসরি তালিকাভুক্তির খসড়া বিধিমালা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছে কমিশন।

এর পাশাপাশি বাজারের অস্থিরতা কমাতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) জরুরি বৈঠক হয়েছে। সেখানে নতুন আইপিও ও আর্থিক পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ঘাটতি দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু এতসব উদ্যোগের পরও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় প্রশ্ন, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরছে কোথায়? বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানও সম্প্রতি বলেছেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার নিয়ে আস্থার অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বাজারের সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করে আস্থা ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নিয়ম-কানুন পরিবর্তন বা নতুন উদ্যোগ ঘোষণা করলেই পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না। উদ্যোগের পাশাপাশি এর কার্যকর ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালো কোম্পানির শেয়ার, নির্ভরযোগ্য তথ্য, অনিয়মের দ্রুত বিচার এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ। বাজারে কারসাজি হলে তার দৃশ্যমান শাস্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে যাতে বিনিয়োগকারীরা যুক্তিসংগত রিটার্নের প্রত্যাশা করতে পারেন, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে।

কারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার নতুন কমিশন, নতুন নীতিমালা ও নতুন আশ্বাস দেখেছেন। কিন্তু বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা না এলে এসব উদ্যোগের সুফল তাদের কাছে পৌঁছায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব বদলাবে, কমিশন বদলাবে, নতুন নিয়ম আসবে, বৈঠক হবে, আশ্বাস দেওয়া হবে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের শেষ ফল যদি বিনিয়োগকারীর লোকসান আর আস্থাহীনতাতেই আটকে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, কমিশন আসে, কমিশন যায়; বিনিয়োগকারীর ভাগ্য বদলায় না কেন?