দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে টানা দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৩৮৮ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকেই সূচক ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী ছিল। ১১ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে থাকলেও ১০ সেপ্টেম্বর এসে দাঁিড়য়েছে ৫ হাজার ৫৪৪ পয়েন্ট।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে অনেকেই অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন। ফলে বাজারে ক্রয়চাপের তুলনায় বিক্রির চাপ বাড়ছে এবং লেনদেনও কাঙ্খিত গতি পাচ্ছে না। ফলে পুঁজিবাজারের সংকট এখন শুধু সূচকের ওঠানামায় সীমাবদ্ধ নয়। বড় সংকট বিনিয়োগকারীদের আস্থায়। বাজারে টাকা খাটানোর আগে একজন বিনিয়োগকারী যদি কোম্পানির ব্যবসা, আর্থিক সক্ষমতা বা বাজারের সম্ভাবনার চেয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে বেশি চিন্তা করেন, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি গভীরে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বিএসইসির দায়িত্ব বাজারকে সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ রাখা। অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে বাজারের স্বাভাবিক গতি আটকে দেওয়া হলে সেই নিয়ন্ত্রণই একসময় বাজারের জন্য বোঁঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পুঁজিবাজারে একটি শেয়ারের দাম বাড়বে, কমবেও। সূচকও একইভাবে ওঠানামা করবে। এটাই বাজারের স্বাভাবিক চরিত্র। তাই দাম বাড়লেই কারসাজি হয়েছে কিংবা দাম কমলেই বাজার ধসে পড়েছে, এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়ন্ত্রকের কাজ মূল্য নির্ধারণ করা নয়, বরং নিশ্চিত করা যে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি যেন কারসাজি ও প্রতারণামুক্ত থাকে। অনিয়মের বিরুদ্ধে জরিমানা প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু জরিমানার সংখ্যা দিয়ে নিয়ন্ত্রকের সাফল্য মাপা হলে সেটি ভুল বার্তা দিতে পারে।

একটি কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করলে কঠোর ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু প্রশাসনিক ত্রুটি, তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছাকৃত ভুল কিংবা নিয়মের ব্যাখ্যাগত সমস্যাকে একই মাত্রার অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কোনো কোম্পানি বা বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে অভিযোগ, প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা দরকার।

কার্যকর শুনানি ও আপিলের সুযোগ থাকতে হবে। এতে নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা কমবে না, বরং সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জরিমানার উদ্দেশ্য যেন রাজস্ব আদায় বা সক্রিয়তা দেখানো না হয়। উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অনিয়ম প্রতিরোধ এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা।

পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য নীতির স্থিরতা অপরিহার্য। উদ্যোক্তা যখন কোম্পানিকে বাজারে আনার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি কয়েক বছরের পরিকল্পনা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করেন। সেখানে নিয়ম ও নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন অনিশ্চয়তা বাড়ায়। নিয়ন্ত্রকের হাতে নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে বলেই নিয়ম বারবার পরিবর্তন করতে হবে, এমন নয়।

ভালো নিয়ন্ত্রক সেই প্রতিষ্ঠান, যার নীতি বাজার আগে থেকেই বুঝতে পারে। বড় নীতি পরিবর্তনের আগে স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, তালিকাভুক্ত কোম্পানি, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে পুঁজিবাজারে। মুলত বিনিয়োগ নিয়ে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে তদন্তে চাপে পড়েছে পুঁজিবাজার। বড় অঙ্কের শেয়ার কিনলেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ফলে অর্থপ্রবাহ কমে গেছে পুঁজিবাজারে। এর প্রভাবে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

এছাড়া জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, শিল্প-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি অন্যতম।

তারা আরো বলছেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।

এছাড়া পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো ভালো কোম্পানি বাজারে আনা। লাভজনক, সম্ভাবনাময় ও সুশাসনসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে না পারলে শুধু নজরদারি বাড়িয়ে বাজার গভীর করা যাবে না। তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, তবে মানের ক্ষেত্রে আপস করা যাবে না। কোম্পানির আর্থিক তথ্য সহজবোধ্য ও সময়মতো প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল ও দীর্ঘদিন লোকসানি কোম্পানির ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় স্পষ্ট নীতি দরকার। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে ওঠে শক্তিশালী কোম্পানি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর।

বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার, তবে সেই নজরদারির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত অনিয়ম শনাক্ত করা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেন, সংঘবদ্ধ কারসাজি, কৃত্রিমভাবে মূল্য বাড়ানো-কমানো এবং গোপন তথ্যের অপব্যবহার দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। সেই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ বাজারকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং বাজারকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিয়ে অপরাধের জায়গায় কঠোর হওয়া দরকার।

পুঁজিবাজারের দুর্বলতার জন্য বিএসইসির নীতি ও সিদ্ধান্তকে দায়ী করে যে সমালোচনা রয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। তবে বাজারের ধসের একমাত্র কারণ হিসেবে বিএসইসিকে দায়ী করা বাস্তবতার সরলীকরণ হবে। সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগকারীদের আচরণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি, সবকিছুই পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করে।

তবে নিয়ন্ত্রকের সিদ্ধান্তের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত বাজারে আস্থা বাড়াতে পারে, আবার অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে। তাই বিএসইসির প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে একটি প্রশ্ন করা উচিত: এতে কি বাজার আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে, নাকি বিনিয়োগকারীর আস্থা আরও কমবে?