মেয়াদ শেষেও বীমার টাকা বঞ্চিত ফারইস্ট লাইফ ইন্সুরেন্সের গ্রাহকরা
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বীমা করলে বোনাস ও মেয়াদ শেষে দেওয়া হবে দ্বিগুণ লাভ’ এমন আশ্বাসে নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিত্তবানদের জীবন বীমা করিয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ৪ থেকে ৫ বছর কেটে গেলেও আমানত ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। এমন কাণ্ডে হতাশ লাখ লাখ গ্রাহকরা। প্রতিদিন ঘুরছেন ফারইস্টের দ্বারে দ্বারে। মিলছেনা কোন উত্তর। এমনকি কেউ আশার বাণীও শুনাতে পারছেনা। ফলে হতাশায় ভূগছেন তারা। এ থেকে মুক্তি পেতে বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।
এদিকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৫ হাজার ৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য পাচারের জেরে গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। হয়রানির শিকার হয়ে বাবুল প্রধান এবং মুহাম্মদ তাওহীদুল ইসলাম নামের দুজন গ্রাহকের পক্ষ থেকে গত ৩ ও ১১ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানিয়েছেন, প্রতারক চক্র ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এরপর সুকৌশলে ব্যাংক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট তথ্য পাচারের এই ঘটনায় কোম্পানিটির সাবেক মুখ্য নির্বাহী এবং আইডিআরএ’র বর্তমান সদস্য (লাইফ) আপেল মাহমুদসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ। কোম্পানিটির আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন শাহবাগ থানায় বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ১৯, ২১ ও ২২ নং ধারায় এই মামলা করেন। মামলা নং- ৯। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- কোম্পানিটির আইটি বিভাগের ইনচার্জ লোকমান ফারুক ও এসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ওসমান গণি।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে কোম্পানির ডিজিটাল ডিভাইসে অবৈধভাবে প্রবেশ করে এই বিপুল পরিমাণ তথ্য সাবলাইন লিমিটেডের কাছে সরবরাহ করেন।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৭ মে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল নম্বর, বেতন-ভাতা এবং পরিচিতি নম্বরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য পাচার করা হয়। এসব তথ্য ‘সাবলাইন লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যা মামলায় আটক হওয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। তিনি সে সময় বেক্সিমকো গ্রুপের মনোনয়নে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের স্বতন্ত্র পরিচালক এবং এনআরসি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। শেখ মামুন খালেদের নির্দেশেই এসব তথ্য হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কোম্পানির সাবেক মুখ্য নির্বাহী আপেল মাহমুদ। প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মালিকানায় আসে বেক্সিমকো গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান জুপিটার বিজনেস লিমিটেড এবং ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দু’টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে বিএসইসি।
এর আগে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে নতুন ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে বিএসইসি। কোম্পানিটির ২১০০ কোটি টাকার বেশি লোপাটের তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসার পর বিনিয়োগকারী, পলিসিহোল্ডার এবং সামগ্রিক পুঁজিবাজারের সুরক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট নগরীর পাঠানটুলাস্থ ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিভাগীয় অফিসে গিয়ে দেখা গেছে ভুক্তভোগীদের জটলা। মাসে মাসে অফিসে আসলেও কোন আশা না পাওয়ায় ভেঙ্গে পড়ছেন অনেকেই। গুরুতর অসুস্থ স্বজনদের চিকিৎসার জন্য অনুনয় বিনয় করলেও মিলছেনা ফল। সেখানে কথা হয় সিলেট নগরীর আরামবাগের বাসিন্দা লাকী বেগমের সাথে।
তিনি জানান, তার স্বামী অসুস্থ ২০২২ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলেও তিনি এখন পর্যন্ত তার প্রিমিয়ামের ১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীকে বিনা চিকিৎসায় মরতে বসতে হচ্ছে। সিলেট সদর উপজেলার বাসিন্দা রুখসানা বেগম জানান, ২০২৩ সালে মেয়াদ পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত তার প্রিমিয়ামের ৭২ হাজার টাকা তিনি তুলতে পারছে না।
এদিকে রাজবাড়ীতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না ৫ শতাধিক গ্রাহক। অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন সদর উপজেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামের মো. ইমাম হোসেন খান নামে এক ভুক্তভোগী। জানা গেছে, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের রাজবাড়ী জোনাল অফিসের আওতায় ১০ বছরসহ বিভিন্ন মেয়াদি ১০ হাজার বীমা গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫ শতাধিক গ্রাহকের বীমা পলিসির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।
বীমার মেয়াদ শেষ হলেও টাকা ফেরত না পেয়ে রাজবাড়ী সদর আমলি আদালতে মামলা করেছেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামের আমান উল্লাহ খানের ছেলে মো. ইমাম হোসেন খান। মামলায় আসামিরা হলেন: ফারইস্টের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম, ফরিদপুর ডিভিশনাল ইনচার্জ মিজানুর রহমান ও রাজবাড়ী জোনাল ইনচার্জ মো. মোজাম্মেল হক। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. ইমাম হোসেন খান ৬ বছর মেয়াদি ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৭ টাকার বীমা পলিসি করেন।
চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার ১ থেকে ২ মাসের মধ্যে জমাকৃত টাকার সঙ্গে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশসহ মূল টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বীমা সংক্রান্ত ফাইল সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেন। এরপর জেলা অফিস, আঞ্চলিক অফিস ও প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট তার টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করে বলা হয়Ñ যেদিন সময় হবে, সেদিন দেব। এরপর তিনি গত ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে মামলা করেন। তদন্ত করে রাজবাড়ী সদর থানার ওসিকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বিচারক। মামলাটি রাজবাড়ী সদর থানার এসআই সামসুদ্দোহা তদন্ত করছেন।
ইমাম হোসেন খান ছাড়াও সাগর সরদারের ১০ বছর মেয়াদি ৫৯ হাজার ৮৮৪ টাকা, নার্গিসের ১০ বছর মেয়াদি ৩৪ হাজার ১২৬ টাকা, মো. আলীর ১০ বছর মেয়াদি ২টি বীমা পলিসির ২ লাখ টাকা, জাহাঙ্গীর শেখের ১০ বছর মেয়াদি ৪ লাখ ৫৭ হাজার ২১০ টাকা, জাকির হোসেনের ১০ বছর মেয়াদি ৬২ হাজার ৬৬০ টাকা, মো. সাবুর ১০ বছর মেয়াদি ৬ লাখ ১১ হাজার ৬৭৫ টাকাসহ ৫ শতাধিক গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
ফারইস্টের রাজবাড়ী জোনাল ইনচার্জ মো. মোজাম্মেল হক বলেন, এ জোনাল অফিসে ১০ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছেন। ৫ শতাধিক গ্রাহকের ডিপোজিটের মেয়াদ শেষ হলেও কোম্পানির মালিকানা জটিলতায় গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তবে কোম্পানি এ বিষয়ে অগ্রসর হয়েছে, খুব দ্রুতই গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আমি দুই মাস আগে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছি, তবে তারা গ্রহণ করেনি।
ফরিদপুর ডিভিশনাল ইনচার্জ মিজানুর রহমান বলেন, অনেক গ্রাহক তাদের বীমা দাবির টাকা পাবেন। আগের মালিকরা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বিধায় টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। তারা অনেকেই জেল-হাজতে রয়েছেন। তবে কিছু গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকের তুলনায় সেই সংখ্যা কম।
ফারইস্টের হেড অফিসের আইন কর্মকর্তা অ্যাডভোকেট জসিম বলেন, গ্রাহকদের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন আগের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তারা। সারাদেশেই এ নিয়ে গ্রাহকরা মামলা করেছেন। বর্তমান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ফখরুল ইসলাম এমপি দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা টাকা উদ্ধার করা ও গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। এদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সামসুদ্দোহা বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। আশা করছি দ্রুতই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করব।



