কোম্পানি আইনে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ চায় বিএসইসি
বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর দীর্ঘ অধিক সময় অতিক্রান্ত হলেও আলোর মুখ দেখেনি বাইব্যাক বা শেয়ার পুনঃক্রয় সংক্রান্ত আইন। নতুন কোম্পানি আইনে বাইব্যাক অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইব্যাক আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
বাইব্যাক হচ্ছে অধিমূল্যসহ (প্রিমিয়াম) কোনো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর শেয়ার দর প্রাথমিক মূল্যের চেয়ে কমে গেলে ওই কোম্পানি কর্তৃক বাজার থেকে শেয়ার পুনঃক্রয়ের বিধান। এটা চালু হলে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পাবেন। পৃথিবীর অনেক দেশে এ পদ্ধতি প্রচলিত থাকলেও দেশে বিদ্যমান কোম্পানি আইনে তা ছিল অনুপস্থিত। বরং কোনো এক অজানা কারণে আটকে আছে এ আইন চালুর প্রক্রিয়া।
তবে বিনিয়োগকারীদের দাবির সাথে একমত পোষন করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে কোম্পানি আইন-১৯৯৪ এর খসড়া সংশোধনীতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কেনার (শেয়ার বাইব্যাক) সুযোগ রাখার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত নেওয়া এবং প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীর এফবিসিসিআই বোর্ড রুমে আয়োজিত কোম্পানি আইন-১৯৯৪ এর খসড়া সংশোধনী সম্পর্কিত এক মতবিনিময় সভায় বিএসইসির পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এ সভার আয়োজন করে। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সভায় বিএসইসির পক্ষে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, কোম্পানি আইনকে সময়োপযোগী করতে শুধু বড় ধরনের পরিবর্তন নয়, বিভিন্ন ধারায় কিছু ছোটখাটো সংশোধনও প্রয়োজন। এসব সংশোধন করা হলে আইনটি আধুনিক ব্যবসাব্যবস্থার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেসবের কয়েকটি প্রতিফলিত হয়নি। এর মধ্যে কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কেনার সুযোগ বা শেয়ার বাইব্যাকের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
বর্তমান আইনের ৫৮ ধারায় কোম্পানির নিজের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্তত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নিজস্ব শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কীভাবে এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে, সে বিষয়ে আগের প্রস্তাবে বিস্তারিত কাঠামোও দেওয়া হয়েছিল বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
আবুল কালাম বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ থাকলে কোম্পানির মূলধন ব্যবস্থাপনা ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই সংশোধনীতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। কোম্পানি আইনের ১৮৩ ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনটির বিভিন্ন পরিভাষাও এখন আধুনিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে। ‘ব্যালান্স শিট’ শব্দটির পরিবর্তে বর্তমানে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ এবং বোর্ড রিপোর্টের পরিবর্তে অ্যানুয়াল রিপোর্ট ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে।
তাই আইনের ভাষাও ব্যবসা ও করপোরেট প্রতিবেদনের বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রকাশ ও সরবরাহের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করেন তিনি। এতে কোম্পানিগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে বলে মত দেন।
এতে কোম্পানিগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে বলে মত দেন।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো আর্থিক বিবরণী ১৮০ দিনের বেশি পুরোনো হলে তা প্রসপেক্টাসে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। বাস্তবে একটি কোম্পানির আইপিও, রাইট শেয়ার বা বন্ডসহ কোনো ধরনের সিকিউরিটিজ ইস্যুর জন্য আবেদন করতে গেলে নিরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করতেই প্রায় ১২০ দিন সময় লেগে যায়। এরপর আবেদন, অনুমোদন এবং নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসসি) প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করে যায়। এ কারণে প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার প্রস্তাব করেন বিএসইসির এই প্রতিনিধি। এ বিষয়ে তাদের দেওয়া লিখিত মতামতও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
তিনি মনে করেন, কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশের করপোরেট খাতের দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা দূর করা সম্ভব। তাই সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।



