মনির হোসেন ও মোবারক হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাত অনেকদিন ধরেই ধুঁকছে। চলছে তারল্য সংকট। আছে ঋণ কেলেঙ্কারি, অর্থ লুট ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো ঘটনা। অনেক ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী আমানতকারীকে টাকা দিতে পারছে না। এতে বাড়ছে আস্থার সংকট। ব্যাংকগুলোর সুদ থেকে নিট আয়ও কমে আসছে। বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি। সামগ্রিকভাবে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংক খাতের মূলধন সংরক্ষণে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ লাগামহীন হারে বেড়ে যাওয়ায় সম্পদের গুণগত মান কমে যাচ্ছে।

পাশাপাশি সম্পদের পরিমাণ কমছে। এতে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকির মাত্রা। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি ব্যাংকগুলোর মূলধন কাঠামোতে সবচেয়ে বড় আঘাত করছে। যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি বাড়ছে তাদের তত বেশি প্রভিশন ঘাটতি হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ। প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ দুজন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ২৪টি ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী মূলধন রাখতে পারবে না। ফলে ঋণখেলাপিদের পেটে চলে যাচ্ছে ব্যাংকের মূলধন। সম্প্রতি প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ দুজন ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ব্যাংক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাংক খাতে ঋণের পোর্টফোলিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রে এই খাতটি মারাত্মক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবে। বিভিন্ন ঋণ ঝুঁকি সম্পর্কিত ধাক্কার মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের ২ জন করে শীর্ষ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে তাদের মূলধন কাঠামো ভেঙে পড়বে। এর ধাক্কা প্রথমে আসবে স্বল্প মূলধন রয়েছে এমন ১৯টি ব্যাংকের ওপর।

এরপর মাঝারি মানের মূলধন আছে এমন আরও ৫টি ব্যাংক ব্যাংকের প্রয়োজনের তুলনায় মূলধন রাখতে পারবে না। সব মিলে ২৪টি ব্যাংক নতুন করে মূলধন ঘাটতিতে পড়বে। ফলে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি আরও বাড়বে। তখন ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতায় আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে ঋণের বিপরীতে রাখা জামানত ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আরও ৩ শতাংশ বাড়তে পারে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ ব্যাংকের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি না মানা ও দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাতে ঋণ আদায় কম হচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। খেলাপি হওয়ার পর ওইসব ঋণ আদায় হচ্ছে না। এতে মন্দ ঋণের পরিমাণও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে পৌনে লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

মোট খেলাপির মধ্যে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা মন্দ (আদায় অযোগ্য) ঋণে পরিণত হয়েছে। ফলে যত খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তত বেশি ব্যাংকের সম্পদের মান কমছে। পাশাপাশি ব্যাংকের আয় কমায় খেলাপি ঋণের বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী প্রভিশন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তখন ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন রাখতে হয়। তখন ব্যাংক আর চাহিদা অনুযায়ী মূলধন রাখতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের নিরাপদ আবরণ তৈরি করতে গিয়ে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে মূলধন। একপর্যায়ে মূলধন ঘাটতিতে পরিণত হচ্ছে ব্যাংক।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ১০ শতাংশের কম মূলধন ছিল ১০টি ব্যাংকের। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ১০ শতাংশ কম মূলধন রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯টি। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে আরও ৯টি ব্যাংকের মূলধন ১০ শতাংশের নিচে চলে গেছে। ১০ শতাংশের বেশি থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ মূলধন রয়েছে গত দুই বছর ধরেই ৪টির রয়েছে। সাড়ে ১২ শতাংশের বেশি থেকে ১৫ শতাংশ মূলধন ছিল এমন ব্যাংকের সংখ্যা ২০২৩ সালে ১৫টি। ২০২৪ সালে তা ৫টি কমে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে।

অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বাড়ায় ৫টি ব্যাংকের মূলধন সাড়ে ১২ শতাংশের নিচে নেমে গেল। ২০২৩ সালে ১৫ শতাংশের বেশি থেকে ২০ শতাংশ মূলধন ছিল এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১৮টি। গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪টিতে। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে ৪টি ব্যাংকের মূলধন ১৫ শতাংশের নিচে নেমে গেল। ২০ শতাংশের ওপরে মূলধন গত দুই বছর ধরেই ১৪টি অপরিবর্তিত রয়েছে। বিদেশি ও বেসরকারি খাতের কয়েকটি ভালো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যেমন বাড়ছে না, তেমনি কমছে না মূলধনও।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন সংরক্ষণের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমনকি সেটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে তলানিতে নেমে এসেছে। অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ার ফলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন অভূতপূর্ব সংকটে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে শক্তিশালী মূলধন সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ

২০২৪ সালে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যা আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ হিসাবে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা কমেছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের মধ্যে মূলধন সংরক্ষণে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। মূলধন পর্যাপ্ততা হারের এই অস্বাভাবিক অবনমনকে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী ব্যাংক খাতের মূলধন সংরক্ষণে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। ২০২৪ সালে দেশটির ব্যাংক খাত মূলধন সংরক্ষণ করেছে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগের বছর ২০২৩ সালে দেশটির ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা ছিল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। যা ২০২২ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক খাত ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতের ব্যাংক খাত ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে। যেখানে বাংলাদেশ মূলধন সংরক্ষণ করেছে মাত্র ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন এবং প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কোনো একটি দেশের ব্যাংক খাতকে কমপক্ষে ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। সেক্ষেত্রে ১২ শতাংশ মূলধন থাকলে সে দেশের ব্যাংক খাতকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মূলত, ঋণখেলাপির কারণে দেশের ব্যাংক খাতে এ ভঙ্গুর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যার মধ্যে বিগত সরকারের অনেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধ করেননি। কিন্তু তাদের ঋণ বিশেষ ছাড়ে নবায়ন করা হয়েছিল। ফলে কিস্তি পরিশোধ না হলেও ব্যাংক তা খেলাপি না দেখিয়ে নিয়মিত হিসাবে রেখেছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর এসব ঋণকে খেলাপি হিসাবে দেখানো হয়। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতের অনিয়ম-লুটপাট ছিল লাগামহীন। ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা তা ফেরত দেয়নি। আবার আমদানি-রপ্তানির আড়ালে কাড়ি কাড়ি টাকা পাচার হয়েছে বিদেশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলোর মূলধন কমে গেলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়ে যায়। এখন অনেক ব্যাংক বিনিয়োগ বা পুনর্বিনিয়োগ করতে পারছে না। কারণ, তাদের অধিকাংশ আয় কমে গেছে। এদিকে, ধারাবাহিক নীতিগত সংস্কার, সুশৃঙ্খল তদারকি ও শক্তিশালী প্রভিশন ব্যবস্থার ফলে পাকিস্তান মূলধন সংরক্ষণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের পর ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কার ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা বেড়েছে।

দেশটির ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক সহায়তা, কঠোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ও দায়বদ্ধ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টেনে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর একত্রীকরণ, খেলাপি ঋণ হ্রাস ও কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কারণে ভারতের ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণ স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। ২০২১ সালে মূলধন পর্যাপ্ততা ছিল ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা হঠাৎ ভেঙে পড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ, এক বছরে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে গেছে।

কেন ভেঙে পড়লো মূলধন পর্যাপ্ততা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় আমাদের মূলধন পর্যাপ্ততা অনেক কম। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ। এসব ঋণের বিপরীতে অনেক ব্যাংক পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখতে পারছে না। এজন্য মূলধন থেকে অর্থ বাদ দিতে হয়েছে।