বিশেষ প্রতিনিধি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দেশজুড়ে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট আরো প্রকট। বিশেষত, পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোয় দিনে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পাশাপাশি গ্যাসের চাপ না থাকায় থমকে গেছে কারখানার চাকা। শিল্পকারখানায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রম। ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বন্ধ থাকছে বেশিরভাগই। যেগুলো খোলা সেগুলোতেও লম্বা লাইন দিয়েও মিলছে না গ্যাস।

ফলে রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচলে প্রায় অচলাবস্থায় বাড়ছে ভাড়া, কর্মহীন চালক-শ্রমিকেরা। গ্যাস-বিদ্যুতের এই অভাবে দেখা দিয়েছে পানির সংকটও। বাসা-বাড়িতে রান্না-বান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গৃহিণীরা। গ্যাস না থাকায় লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এতে দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেছে। কর্মজীবীদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আবাসিক ঘরবাড়িতে সারাদিনই চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছেন কম।

ফলে জীবন-জীবিকাসহ ঘর-গৃহস্থালিতে অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে। এর ওপরে বিদ্যুৎ না থাকায় বসতবাড়িতে গিয়েও শান্তি পাচ্ছেন না। এতে মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা।

দেশে তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনজীবন ও অর্থনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নায় বিঘ্ন, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ধসের কারণে মানুষ চরম দুর্গতিতে পড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে সড়কে গাড়ি কমে গেছে। ভাড়া বেড়ে গেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষাথীরা পড়ালেখা করতে পারছেন না। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য এরই মধ্যে দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে সব ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মফস্বলে তীব্র চললেও এখন খোদ রাজধানীতে লোডশেডিং চলছে। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। বিশেষ করে দেশের গ্রামাঞ্চলে ১৫-১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, মাসখানেক ধরেই গ্যাস সংকটে ধুঁকছে দেশ। মাঝে কয়েক দিন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ফের এলএনজি সরবরাহ কমায় আবারও তীব্র ভোগান্তি বেড়ে গেছে। রাজধানীসহ দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না গ্যাস। গ্যাসের হাহাকারে সংকটে আবাসিক খাতও। কলাবাগান, ধানমন্ডি, মিরপুর, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকার বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা।

এদিকে দেশে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এর ফলে বাসাবাড়ির রান্না থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা সব খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে ভারী শিল্পে। গ্যাস এবং এলএনজি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় স্টিল, সিরামিক, কাচের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর উৎপাদনক্ষমতা শূন্যে নেমেছে। তেমনি তীব্র লোডশেডিংয়ের সঙ্গে গ্যাস সংকটে নাজেহাল জনজীবন। বিদ্যুতের লুকোচুরিতে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।

বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীসহ ও সব ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে বাড়ছে বিড়ম্বনা। ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না গ্যাস। চুলা না জ্বলায় বাসাবাড়িতে শেষ নেই দুর্ভোগের। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং। ভ্যাপসা গরমে জনজীবনে নাভিশ্বাস। এর মধ্যে গ্যাস সংকট আরও তীব্র।

এছাড়াও গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে শিক্ষাথী, শিশু, বৃদ্ধ ও হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে থাকা রোগীরা বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তেমনি হবিগঞ্জে শিল্প এলাকায় তৃতীয় দিনের মতো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে বন্ধ আছে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন। প্রায় সবগুলো কারখানাতেই অলস সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক।

উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিল্প মালিকরা। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। সাগর উত্তাল থাকায় সামিট এলএনজি টার্মিনালে থাকা কার্গো থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতির কারণে টার্মিনালে থাকা কার্গোটিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটের পাম্পে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল শুক্রবার সকালে হঠাৎ ত্রুটি দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ ইউনিটটি বন্ধ করে দেয়। এটি চালু করতে একদিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক জানান, ১ নম্বর ইউনিটের পাম্পের ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। চাঁদপুরে তীব্র গ্যাস সংকটে যানবাহন ও জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে গ্যাস সরবরাহের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষুব্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা।

গতকাল সকাল থেকে জেলার সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুপুরে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের হাজীগঞ্জ এইচবি ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রায় আধা ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখেন চালকরা। গ্যাসের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও প্রাইভেটকারের চালকেরা রাত থেকে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন। চালকরা জানান, সারারাত নির্ঘুম থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তারপরও গ্যাস মিলছে না।

চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় আবাসিক, পরিবহন ও বাণিজ্যিক-সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। কোথাও চুলা জ্বলছে না, কোথাও সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, আবার কোথাও গ্যাসের অপেক্ষায় রাত কাটাচ্ছেন চালকেরা। গ্যাস না পেয়ে নগরের ষোলশহর এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা।

অন্যদিকে গাজীপুরের শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। কোথাও অর্ধেক, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম। ফলে অলস সময় পার করছেন কোনো কোনো কারখানার শ্রমিকরা। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকরা। তৈরি হচ্ছে বায়ার হারানোর আশঙ্কাও। শিল্পে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়ায় লোডশেডিং কমলেও কারখানায় শুরু হয়েছে গ্যাসের সংকট। শিল্পোৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চিন্তিত ব্যবসায়ীরা।

তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক ভয়াবহ গ্যাস সংকটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। কিন্তু খাতা কলমে বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। কিন্তু তারপরও বিদ্যুৎ নিয়ে কেন এই অস্থিরতা? বাংলাদেশে বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট এবং রেকর্ড পরিমাণ লোডশেডিংয়ের পেছনে তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশই গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু মহেশখালীতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। এ ছাড়া দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়ার মতো বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও এই নিয়ে জটিলতা বেড়েছে।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলছেন, অতীতের ভুল নীতির ফলেই দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৌশলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের হাতে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই বলেও জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মালিকানাধীন ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলীদের মাধ্যমে এটি সচল করার অপেক্ষা করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার নেই।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমার সম্ভাবনা কম। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ ব্যয় বেড়েছে, তা কমাতে হবে। জ্বালানি সংস্থান কীভাবে বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করতে হবে।