হঠাৎ অস্থির চালের বাজার, বিশ্ববাজারে চালের দাম নিম্নমুখী
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সারাদেশে আবারও বেড়েছে চালের দাম। চড়া দামের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। হঠাৎ করেই বাজারে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ২ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব বেশি পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর নিত্য খরচে। এসব পরিবারে বেড়েছে উৎকণ্ঠা, চেপে বসেছে সংসার চালানোর বাড়তি চাপ। ফলে চালের দামে ক্রেতাদের দিশাহারা অবস্থা। ব্যবসায়ীরা বলছেন মিলাররা সিন্ডিকেট করে চালের দাম বৃদ্ধি করছে। সরকার এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, চাহিদা কমায় বিশ্ববাজারে নিম্নমুখী চালের মতো খাদ্যশস্যের দর। জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে বাসমতিসহ বিভিন্ন জাতের চালের চাহিদা কমেছে। এতে দানাদার এই খাদ্যশস্যের দাম কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ দেশের বাজারে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে চালের কোনো সরবরাহ সংকট নেই। বাড়েনি চাহিদাও। পরিবহন ব্যয় বা শ্রমিকের মজুরি বাড়ার তথ্যও নেই তাদের কাছে। তবে সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, চাল আমদানি ও অভ্যন্তরীণ ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম বাড়তি। সরকার চালের বাড়তি দর নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এবার বোরোর বাম্পার ফলনে রেকর্ড ২ কোটি ১৪ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। বোরো মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ ধান উঠলেও কুরবানির ঈদের পর চালের দাম হঠাৎ করে কেজিতে ৪ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। এতে একদিকে যেমন ভোক্তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। অন্যদিকে কৃষকরাও অসন্তুষ্ট। কেননা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মিলাররা ইতোমধ্যে মজুদ করে রেখেছে। এখন তারা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো চালের দাম বৃদ্ধি করছে।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, চালের দাম বাড়ার বড় কারণ ধানের দাম বেশি। ধানের দাম বেশি হলে চালের দাম কীভাবে কমবে? তারা বলেছেন, বড় বড় অটো রাইস মিল ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রতিযোগিতা করে ধান কেনে। বোরো মৌসুমের সব ধান এখন তারা মজুত করেছে। ফলে কৃষকের হাতে ধান নেই বললেই চলে। এতে হাটবাজারগুলোতে ধানের দাম বেড়ে গেছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে।
রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৮২ টাকায়, যেখানে ঈদের আগে এ দাম ছিল ৭২ থেকে ৭৪ টাকা। মোজাম্মেল মিনিকেটের দাম ছিল ৭৫ টাকা, যা বেড়ে এখন ৮৮ থেকে ৯০ টাকায় পৌঁছেছে। মাঝারি দানার চাল ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ও পাইজাম কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৪ টাকায়। আর মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণার দাম বেড়ে এখন কেজি ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের চেয়ে ২ থেকে ৪ টাকা বেশি।
পাইকারি বাজারেও চালের দাম একইভাবে বেড়েছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এখন ৫০ কেজির এক বস্তা মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। ঈদের আগে এ বস্তার দাম ছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। ব্রি-২৮ ও পাইজাম চালের বস্তা (৫০ কেজি) এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়, যা ঈদের আগে ছিল ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা। পাইকারি চাল বিক্রেতা মো. সালাম বলেন, এখন চালের দাম বাড়ার কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু ঈদের পর থেকে প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। কেন বাড়ছে সে বিষয়ে সরকারের কোন তদারকি নেই। আসলে বাজার সিন্ডিকেট এ সরকারও ভাঙ্গতে পারছে না।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এখন বাজারে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। এছাড়া, সরকারের গুদামেও যথেষ্ট পরিমাণে চাল মজুত আছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারের গুদামে চাল ও গমের মজুত রয়েছে ১৭ দশমিক ৬৪ লাখ মেট্রিক টন, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ টন বেশি।
চালের দাম বাড়তি প্রসঙ্গে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাদামতলী ও বাবুবাজার চাল আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি নিজামউদ্দিন বলেন, দেশের ধান, চালের বাজার এখন অটো রাইস মিল ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে। তারা বাজার থেকে প্রতিযোগিতা করে ধান কেনে। ফলে ধানের বাজার বাড়তি। এছাড়া বর্তমান আবহাওয়াও চাল উৎপাদনের জন্য উপযোগী নয়। এরও বিরূপ প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। দেশে ধান-চালের অন্যতম বড় মোকাম উত্তরাঞ্চলের বগুড়া।
চালের দাম বাড়া প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, বাজারে ধানের দাম বেশি। এ কারণে চালের দাম বাড়ছে। গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করে বাজার থেকে হাজার হাজার মণ ধান কিনেছে। সরকার তাদের কিছুই বলে না।
অথচ সাধারণ মিলাররা ৫০০ মণ ধান কিনলেই সরকার ব্যবস্থা নেয়। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বগুড়ায় সাড়ে ৭০০ মিল রয়েছে। অথচ ২০২২ সালে বগুড়ায় ২ হাজার ৩৫টি মিল ছিল। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে সাধারণ মিলাররা চাল ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে তদারকি বাড়াতে হবে। কর্পোরেট হাউজগুলোর মজুদ কমাতে হবে।
বাজার বিশ্লেষক ও কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিল মালিকরা ধান মজুত করে রেখেছে এবং এখন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। তারা ঈদের আগেই কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে গুদামে মজুত করেছেন। এখন নানা অজুহাতে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
নওগাঁ চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, সম্প্রতি বৃষ্টির কারণে বোরো ধানের গুণগত মান কিছুটা নষ্ট হয়েছে। ফলে ধানের দাম বেড়েছে। গত ১৫ থেকে ২০ দিনে প্রতি মণ ধানের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। এর ফলে মিল পর্যায়ে চালের দাম কেজিতে ২ টাকা করে বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রেকর্ড পরিমাণ চাল উৎপাদন হলেও কৃষক ও ভোক্তা কেউই এর সুফল পাচ্ছেন না। কারণ, ধান যখন কৃষকের হাতে থাকে, তখন দাম কম থাকে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের হাতে যাওয়ার পর চালের দাম বাড়তে থাকে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ব্যবসায়ীদের মানসিকতা বদলায়নি। বাজার সিন্ডিকেট একই রয়ে গেছে। গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ী বাজারকে অস্থির করে তুলছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা রহস্যজনক। আমরা বিভিন্ন ব্যানারে সারা দেশেই চালের মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু সরকার জনগণের কথা ভাবছে বলে মনে হচ্ছে না। আর সবসময় কৃষকের হাতে যখন ফসল থাকে তখন দাম কমিয়ে রাখা হয়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার যখন কৃষকের হাত থেকে পণ্য চলে যায়, তখন দাম বাড়িয়ে ভোক্তাকে ক্ষতির মুখে ফেলা হয়। সরকার এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এ ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।



